কেউ উচ্চারণ করে না ভাষা সৈনিক ‘তোয়াহা’ ও সানাউল্লাহ নূরী নাম

53

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: ২১ ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) যখন আসে, তখন জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হয়। আলোচনা সভাগুলোতে ওঠে আসে ভাষা সৈনিক সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, সফিউলসহ অনেকের নাম। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের দুইজন ভাষা সৈনিক ‘কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা’ ও সানাউল্লাহ নূরীর নাম কেউ উচ্চারণ করেন না। ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদ না হলেও কমরেড তোয়াহা এবং সানাউল্লাহ নূরী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রেখেছেন অসামান্য অবদান।
সানাউল্লাহ নূরী একাধারে একজন সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক ছিলেন। আর কমরেড তোয়াহা ভাষা আন্দোলনের পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপরও এই মহান দুই ব্যক্তিকে স্মরণে নেই কোনো উদ্যোগ।

মোহাম্মদ তোয়াহা: ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ এবং বিশ্ব বিখ্যাত মুক্তজ্ঞান কোষ উইকিপিডিয়ায় কমরেড তোয়াহা’র কৃতকর্মের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। উইকিপিডিয়া অনুসারে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা’র ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা অবদান তুলে ধরা হলো। মোহাম্মদ তোয়াহা ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন। এই আন্দোলনের সময় তাকে অন্যতম একজন ছাত্রনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯২২ সালের ২ জানুয়ারি মোহাম্মদ তোয়াহা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কুশাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে তার পরিবার কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট এলাকায় স্থানান্তরিত হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন। পরে ১৯৪৮ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করেন।
১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসে সে সময়ের মঙ্গার বিরুদ্ধে নামতে গিয়ে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে অধিকাংশ পোস্টার, লিফলেট, নিবন্ধ তৈরি করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তারিখে যখন তোয়াহা’র নেতৃত্বে একটি দল সচিবালয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে যান, তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তিনি ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হন এবং অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে তাকে হাসপাতালে এক সপ্তাহ থাকতে হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির একজন নেতা হিসেবে কমরেড তোয়াহা সরকারের সঙ্গে সকল ধরনের বৈঠকে অংশ নিতেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ভিপি ছিলেন। যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেখানে এসেছিলেন তোয়াহা তাকে তাদের ভাষা সম্পর্কে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। সরকার যখন আরবি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে বাংলা লেখার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিল তখন তিনি এর বিরুদ্ধে  সোচ্চার ছিলেন। সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদে তিনি সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৫২ সালের শেষের দিকে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। দুই বছর পর মুক্তি পান এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন যেখানে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবেও তিনি নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় রামগতি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন তিনি। মোহাম্মদ তোয়াহা ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম. এল.) নাম ত্যাগ করে শুধু কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল) নাম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা মুক্তিযুদ্ধে বা পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য বাম দল ও গ্রুপের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা. লে.) গঠন করেন। ২৯ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা মৃত্যুবরণ করেন।
তখন অবিভক্ত রামগতি বর্তমান কমলনগর উপজেলার হাজিরহাটে তাকে সমাধিস্থ করার পর ওই স্থানেই কমরেড তোয়াহা স্মৃতি রক্ষায় একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। ১৯৯২ সালে হাজিরহাট বাজারের পাশে ‘কমরেড তোয়াহা’র নামানুসারে ‘তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যায়েদ বিল্ল্যাহ জানান, ভাষা সৈনিক কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা স্মৃতি রক্ষায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ১৯৯২ সালে বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে এটি সরকারের এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭০০ শিক্ষার্থী রয়েছে।
চলতি বছর থেকে এখানে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুুতি সম্পন্ন হয়েছে। কমরেড তোয়াহা’র পারিবারিক বিষয়ে জানাযায়, কমরেড তোয়াহা’র দুই মেয়ে রয়েছে, তার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। বড় মেয়ের নাম শাহানা বেগম ছিনু, আর ছোট মেয়ের নাম রেহানা ইয়াসমিন পুষ্প। ছিনুর স্বামী এ্যাডভোকেট আবুল খায়ের, আর পুস্পর স্বামী কর্নেল (অব.) আব্দুল খালেক। দুজনই স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন।

সানাউল্লাহ নূরী: ভাষা সৈনিক সানাউল্লাহ নূরী সম্পর্কে জানা যায়, তিনি ছিলেন, একাধারে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
১৯২৮ সালের ২৮ মে লক্ষ্মীপুর জেলার অবিভক্ত রামগতি বর্তমান কমলনগর উপজেলার চর ফলকন গ্রামে তার জন্ম। দারুচিনি দ্বীপের দেশ, ভ্রমনকাহিনী, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, কবিতাসহ অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থের লেখক ছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় তিনি বাম
ছাত্র রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় যোগ দেন।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা কলেজের নুরপুর ভিলা ছাত্রাবাসে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামক সেমিনারে তিনি যোগ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলেন।
১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের মূখপত্র ‘অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ইহসানের’ সহযোগী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সানাউল্লাহ।
এ পত্রিকাটি মূলত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
তিনি এক নাগাড়ে দীর্ঘ ৫০ বছর সাংবাদিকতার জীবনে দৈনিক সংবাদ (১৯৫২-৫৭), দৈনিক আজাদ (১৯৪৮), দৈনিক সৈনিক, দৈনিক নাজাত, দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৫৮), মাসিক সওগাত (১৯৬০), দৈনিক বাংলা, দৈনিক গণবাংলা, দৈনিক কিশোর,  দৈনিক দেশ, দৈনিক জনতা, দৈনিক দিনকালসহ তৎকালীন অসংখ্য দৈনিকে সম্পাদক, সহযোগী সম্পাদক ও সহকারী সম্পাদক সহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৯৭ সালের মে মাসে দৈনিক দিনকালের সম্পাদক থাকাকালীন অবস্থায় অসুস্থ হলে তিনি আর আরোগ্য লাভ করেন নি। অবশেষে ২০০১ সালের ১৬ জুন ৭৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য গল্প, ছোট গল্প, ছড়া কবিতা এবং উপন্যাস। এ পর্যন্ত তার ৫০টি  গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং অপ্রকাশিত রয়েছে আরো ৫০টি পান্ডুলিপি।
তার লেখা “দারুচিনি দ্বীপের দেশে” গল্পটি নব্বইয়ের দশকের মাধ্যমিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য আড়োলন সৃষ্টিকারী একটি রচনা ছিল।
এছাড়া তার উল্লেখযোগ্য রচনা নোয়াখালীর ভাষায় লিখিত উপন্যাস “আনধার মানিকে রাজকন্যা”, নিঝুম দ্বীপের উপাখ্যান, রোহিঙ্গা কন্যা, ইতিহাস গ্রন্থ বাংলাদেশের ইতিহাস ও সভ্যতা, নোয়াখালী-ভুলুয়ার ইতিহাস ও সভ্যতা ইত্যাদি।

বিডিসংবাদ/এএইচএস