নরসিংদীতে পানির অভাবে জাতীয় ফুল শাপলার প্রাকৃতিক উৎপাদন বিলুপ্তি

170

নরসিংদী প্রতিনিধিঃ  নরসিংদীতে পানির অভাবে দেশের জাতীয় ফুল শাপলার প্রাকৃতিক উৎপাদন বিলুপ্তির পথে। জেলার অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-ভাওড়, পুকুর সহ জলাশয় সমূহ প্রবল ভাবে হ্রাস পাওয়া এবং ভূমি দস্যুদের দখলে চলে যাওয়ার ফলে পানির শূণ্যতা দেখা দেয়ায় শাপলা ফুলের উৎপাদন ব্যাপক ভাবে হ্রাস পায়। বাংলা নাম শাপলা ফুল, ইংরেজী নাম হল লিলি, মনিপুরী ভাষায় থরো, আংগৌরা, তামিল ভাষায় ভেলাম্বাল, সংস্কৃত ভাষায় কুমুডা, আসাম ভাষায় শাপলা ফুলকে নাল বলা হয়। শুধু বাংলাদেশ নয় শ্রীলংকায়ও জাতীয় ফুল এই শাপলা। শ্রীলংকায় শাপলাকে বলে নীল-মাহানেল। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটল এর এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এটা একটি জলজ উদ্ভিদ যা প্রায় ৩’শ খৃষ্টপূর্ব পুরানো। নরসিংদীতে সাধারণত ৩ প্রকার শাপলা ফুল দেখা যায়। সাদা, লাল, বেগুণী রঙ্গের। এর মধ্যে সাদা শাপলা হলো বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। নরসিংদীর সর্বত্র অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, ঝিল, হাওড়-ভাওড়, পুকুর সহ জলাশয় সমূহে দেখা যেত এই জলে ভাসা শাপলা ফুল। নরসিংদীতে কল-কারখানার বৃদ্ধিতে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-ভাওড় ভূমি দস্যুদের দখলে চলে যাওয়ায় ক্রমশ হ্রাস পেয়ে যাওয়ায় এবং কৃষি জমিতে অধিক পরিমানে কীট নাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারণে জাতীয় ফুল শাপলা বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

নরসিংদী জেলার বেলাব, মনোহরদী, রায়পুরা, শিবপুর, পলাশ, সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছু লাল শাপলা দেখা গেলেও সাদা, হলুদ, নীল, বেগুণী শাপলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখনও দূর-দূরান্ত হতে আসা বিভিন্ন পর্যটকরা রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের হালদার ব্রিজ, শিবপুর উপজেলার দুলালপুর চিনাদী বিল, মনোহরদী উপজেলার মাধুশাল বিল, বেলাব উপজেলার বাবলা বিল, আড়িয়াল খাঁ নদীতে লাল শাপলা দেখতে ভিড় জমায়। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় খাল-বিল জলাশয় ও নিচু জায়গায় পানি জমা থাকলে সেখানেই প্রাকৃতিক ভাবেই জন্ম নেয় আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। কিছু দিন আগেও বেলাব উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে শাপলা ফুল দেখা যেত। তখন পুকুর খাল বিল ও জলাশয় গুলিতে লাল, সাদা, বেগুণী ও বিরল প্রজাতির হলুদ শাপলা ফোঁটার কারণে চারিদিকে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিণত হতো ।

নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে লাল প্রজাতির শাপলা দেখা গেলেও দেখা যাচ্ছেনা সাদা, গোলাপী, বেগুণী, নীল ও হলুদ শাপলা। এসব শাপলা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে, নরসিংদী সচেতন মহল এর বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। কারো কারো মতে মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায়, ভূমি দস্যুরা জলাশয় ভরাট করে কৃষি জমি তৈরী, ঘর বাড়ী তৈরী, ফসলী জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নরসিংদী থেকে জাতীয় ফুল শাপলা হারিয়ে যেতে বসেছে।

এক সময়ে নরসিংদীর ঝিলে বিলে পুকুরে বর্ষা মৌসুমে নানা রঙ্গের শাপলার বাহারী রূপ মানুষের নয়ন জুড়িয়ে যেত। শাপলা ছোটদের খুব প্রিয়। শাপলার ভ্যাট বাচ্ছাদের প্রিয় খাদ্য এবং গ্রামের লোকেরা ভ্যাট দিয়ে খই ভেজে মোয়াসহ বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরী করে খেত। নরসিংদীর গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে সব্জী হিসেবেও খুব জনপ্রিয় এই শাপলা। অনেকে আবার শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এছাড়া লাল শাপলার অনেক ঔষধী গুন রয়েছে। যেমন শাপলার মূল কান্ড খেলে আমাশয়ের মত রোগ ভালো হয় বলে জানা যায়। এ বিষয়ে সচেতন মহল জানান, আমাদের জাতীয় স্বার্থে শাপলা ফুলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, নতুবা অচিরেই হারিয়ে যাবে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ও জাতীয় ফুল শাপলা।