নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ৭ খুনের রায় : ২৬ জনের ফাঁসি

মন্ত্রী মায়ায় জামাতা ও আ’লীগ নেতা নূর হোসেনসহ ৯জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড

125

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ

নারায়গঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় আ’লীগ নেতা নূর হোসেন ও মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর জামাতা সাবেক লেফটেন্যান্ট চাকুরিচ্যুত কর্নেল তারেক সাঈদসহ ২৬ জনের ফাঁসি ও বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টা ৫মিনিটে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন এই রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দিয়েছেন আদালত।এ সময় আদালতে মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে ২৩ জন উপস্থিত ছিলেন। আলোচিত এ মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে ১৭ জনই র‌্যাব সদস্য। মামলার শুরু থেকেই র‌্যাবের সাবেক ৮ সদস্যসহ ১২ জন আসামি পলাতক।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছ থেকে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার অপরাধে আসামিদের সাজার এই রায় দেন আদালত। গ্রেফতার ২৩ আসামির সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৩০ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন আদালত।
এদিকে রবিবার রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এই মামলার রায় সম্পর্কে তার প্রত্যাশার ব্যক্ত করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। যাদের কাজ জনগণের জানমাল রক্ষা করা, তারাই যদি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড লিপ্ত হন, তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।’

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। ওই মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেনকে প্রধান করে ৬জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই বিজয় ডা; কুমার পাল বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় আরও একটি মামলা করেন। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে স্বজনরা লাশগুলো শনাক্ত করেন।

২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় ৩০শে নভেম্বর। চার্জ গঠন থেকে শুরু করে মামলার ৪১তম কার্যদিবস শেষে আদালত রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। আসামিদের মধ্যে ২৫ জন র‌্যাব সদস্য ও ১০ জন নূর হোসেন ও তার সহযোগী। মামলায় মোট ১০৬ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। র‌্যাব-১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তা তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এমএম রানা এবং নূর হোসেনসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। পলাতক ১২ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ ৬ জন আইনজীবী নিয়োগ দেন। তারা পলাতক আসামিদের পক্ষে বিচার কার্য পরিচালনা করেন। পলাতকদের মধ্যে র‌্যাব’র ৮ সদস্য ও নূর হোসেনের ৪ সহযোগী রয়েছেন।

এ হত্যাকান্ড পর নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যায়। ২০১৪ সালের ১৪ জুন রাতে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের কাছে কৈখালী এলাকার একটি বাড়ি থেকে নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে বাগুইআটি থানার পুলিশ। পরে ওই বছরের ১৮ আগস্ট নূর হোসেন, ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বারাসাত আদালতে চার্জশিট জমা দেয় বাগুইআটি থানা পুলিশ। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দমদম কারাগার কর্তৃপক্ষ নূর হোসেনকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এরপর ১৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নূর হোসেনকে।

তিন জন তদন্তকারী কর্মকর্তার ১১ মাসের দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া নূর হোসেন,  র‌্যাবের চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এজাহারভুক্ত ৫ আসামি অব্যাহতির আবেদন করা হয়।  মামলায় ১২৭ জনকে সাক্ষী করা হয়। ১৬২ ধরনের আলামত উদ্ধার দেখানো হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত ৩৫জনের মধ্যে ২৩জন গ্রেফতার রয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের দু’টি মামলায় গ্রেফতারকৃত ২৩ জনের উপস্থিতিতে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চার্জ গঠন করেন। শুনানির সময়ে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা ২৩ জনের অব্যাহতি আবেদন করলে আদালতে  নাকচ করে দেন। পলাতক ১২ জনসহ সাত খুনের দুটি মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ জনের সবার বিরুদ্ধেই চার্জগঠন করা হয়। ১২ জনের অনুপস্থিতিতেই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাদের পক্ষে ৫জন আইনজীবী নিযুক্ত করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেনের জবানবন্দিতে যেভাবে ঘটে হত্যাকান্ড : ২০১৪ সালের মার্চ মাসে আদমজীনগরে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর হেডকোয়ার্টারে আমাদের অফিসার্সদের কনফারেন্স ছিল। ওই কনফারেন্সে সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ কাউন্সিলর নজরুলকে আমাকে টার্গেট হিসেবে দেন। টার্গেট নজরুলকে ধরার জন্য সিও স্যার লে. কমান্ডার রানাকে আমাকে সাহায্য করার নির্দেশ দেন। এরপর আমি ও রানা স্যার মিলে একাধিকবার নজরুলকে ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু বার বার ব্যর্থ হই। ওই সময় নজরুলকে ধরার জন্য আমরা সঠিকভাবে তথ্য পাচ্ছিলাম না। তখন আমরা নজরুলের প্রতিপক্ষ অপর কাউন্সিলর নূর হোসেনকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করি। ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে নূর হোসেন আমাকে ফোন করে বলে যে, নজরুল আজকে নারায়ণগঞ্জ কোর্টে হাজিরা দিতে এসেছে। তখন তাৎক্ষণিকভাবেই আমি ওই সংবাদটি আমার সিও স্যার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে জানাই। সিও স্যার তখনই আমাকে ও রানা স্যারকে নজরুলকে ধরার জন্য অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। আমি আনুমানিক সাড়ে ১০টার সময় অভিযানের বিষয়ে রানা স্যারের সঙ্গে কথা বলি এবং তখনই আমি আমার নীল রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে আমার টিমসহ কোর্টের উদ্দেশে বের হই। আমি আমার টিমের সদস্য হাবিলদার এমদাদ, এসআই পুর্নেন্দু বালা, নায়েক দেলোয়ার (ড্রাইভার), নায়েক বেলাল, নায়েক হীরা, নায়েক নাজিম, সিপাহী তৈয়ব, সৈনিক আলীম, সৈনিক আলামিন, সৈনিক মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শিহাব একত্রে নীল রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে বের হই। আনুমানিক বেলা ১১টার সময় আমরা কোর্টের বাইরের গেটে এসে উপস্থিত হই। ওই সময় আমি আমার টিমের সদস্য হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল, সিপাহী তৈয়বকে কোর্টের মধ্যে পাঠাই নজরুলের গতিবিধি নজরদারী করার জন্য। আমরা কোর্টের বাইরে রাস্তার পশ্চিম পাশে অপেক্ষা করছিলাম। বেলা সোয়া ১১টার দিকে একটি সিলভার কালারের মাইক্রোবাসে করে রানা স্যারের টিমের ৭/৮ জন সদস্য আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই সময় রানা স্যার মাইক্রোবাসে ছিলেন না। আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে রানা স্যার নিজের গাড়িতে করে এসে গাড়ি ছেড়ে দেন এবং আমার মাইক্রোতে আমার পাশের সিটে বসেন। ওই সময় আমি রানা স্যারকে জানাই যে, নজরুলের সঙ্গে তার ১৫/১৬ জন সহযোগী আছে। রানা স্যার সিনিয়র হওয়ার কারণে তখন তিনি অপারেশন কমান্ডার হয়ে যান এবং তিনি যেভাবে প্লান করেন সেভাবেই কাজ হয়। ওই সময় রানা স্যার প্ল্যান করেন যে, রুটিন পেট্রল টিমের সদস্যদের দিয়ে ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকায় সিটি করপোরেশনের গেটের কাছে ফাঁকা এলাকায় নজরুলের গাড়িটি থামাবেন। আনুমানিক ১টার দিকে নজরুল একটি সাদা প্রাইভেটকারে করে কোর্ট থেকে বের হয়ে সাইনবোর্ডের দিকে যায়। তখন আমি ও রানা স্যার আমাদের মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে নজরুলের গাড়ির পিছু পিছু যাই। রানা স্যার ওই সময় নজরুলের গাড়ির বর্ণনা দিয়ে পেট্রল টিমকে ওই গাড়িটি থামাতে বলে। আনুমানিক দেড়টার দিকে পেট্রল টিম চেকপোস্ট বসিয়ে সিটি করপোরেশনের গেটের কাছে নজরুলের গাড়িটিতে থামায়। তখন আমরা পেছন থেকে গিয়ে নজরুলের গাড়ি থেকে নজরুলসহ ৫ জনকে বের করে আমার মাইক্রোবাসে তুলি। ওই সময় আমাদের পেছনে একটি অ্যাশ কালারের প্রাইভেটকার এসে থামে এবং ওই গাড়ি থেকে একজন ভদ্রলোক নেমে চিৎকার করতে থাকে। ওই সময় রানা স্যার ওই ভদ্রলোক ও তার ড্রাইভারকে তার মাইক্রোবাসে তুলে নেন। আমি ওই ৫ জনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে কাঁচপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই এবং রানা স্যারকে বলি আমার গাড়িটিকে ফলো করার জন্য। আনুমানিক ১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারাবো নামক এলাকায় পৌঁছাই। ২/৩ মিনিটের মধ্যেই রানা স্যারের গাড়িটি তারাবো পৌঁছায়। তারাবো পৌঁছে আমি আমার সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ স্যারকে রিপোর্ট করি যে নজরুলসহ ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তখন সিও স্যার বলেন যে, কোন প্রত্যক্ষদর্শী রাখা যাবে না। ৭ জনকেই গুম করে ফেলো। সিও স্যারের আদেশ পেয়ে আমি আমার ক্যাম্পের বেলালকে বলি ৭ সেট ইটের বস্তা তৈরী করার জন্য। তারাবো আসার পথে রানা স্যার চিটাগাং রোডে মাইক্রোবাস থেকে নেমে যান এবং সিও স্যারের অফিসে চলে যান। আমি নায়েক বেলালকে ইটের বস্তা তৈরি করতে বলে মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে নরসিংদীর দিকে চলে যাই। আনুমানিক আড়াইটার দিকে আমি নরসিংদী র‌্যাব ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছাই। ওই সময় আমি নরসিংদী ক্যাম্প কমান্ডার সুরুজকে ফোন করি এবং তার সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে দেখা করি। ওই সময় আমি মেজর সুরুজের নিকট থেকে ২ হাজার টাকা নিই এবং ক্যাম্পের বাইরে আমরা সবাই লাঞ্চ করি। আনুমানিক ৪ টার দিকে শিবপুর উপজেলার দিকে চলে যাই এবং একটি নির্জন জায়গায় অপেক্ষা করতে থাকি। আনুমানিক রাত ৮টার দিকে সিও স্যারকে জানাই যে, আমরা নারায়ণগঞ্জে আসতে চাচ্ছি। তখন সিও স্যার বলেন যে, রাস্তায় পুলিশের কড়া নজরদারী চলছে, আমি ৩ টনি ট্রাক পাঠাচ্ছি। তোমরা ওই ট্রাকে করে আসামিদের নিয়ে এসো। তখন আমি সিও স্যারকে বলি যে, ট্রাক আসতে অনেক দেরি হবে, আমরা মাইক্রোবাস নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসছি। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে আমরা নরসিংদীর বেলানগর পৌঁছাই। বেলানগর পৌঁছিয়ে আমি সৈনিক মহিউদ্দিনকে বলি ৭টি সাকসা (চেতনানাশক ইনজেকশন) এবং একটি সিরিঞ্জ কিনে আনতে। আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে আমরা কাঁচপুরে পৌঁছাই। কাঁচপুর পৌঁছিয়ে আমরা একটি পরিত্যক্ত পেট্রোল পাম্পে অপেক্ষা করতে থাকি। ওই সময় আমি সিওকে ফোন করে বলি যে, স্যার রাস্তায় পুলিশের কড়া নজরদারী চলছে। এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ শহরে ঢোকা আমার জন্য ডিফিকাল্ট। রানা স্যার যেন ট্রলারটি কাঁচপুর ব্রীজের নিচে পাঠিয়ে দেন। তার কিছু সময় পরে রানা স্যার সিও স্যারের অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে আমাকে জানান যে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচেই ট্রলার থাকবে। তারপর আমি নূর হোসেনকে ফোন করে বলি যে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচে যেন মানুষের কোন জটলা না থাকে। আনুমানিক রাত ১১টার দিকে আমি মাইক্রোবাস ২টিসহ কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বিআইডব্লিউটিএ-এর ঘাটে পৌঁছাই। আনুমানিক রাত সাড়ে ১১টার দিকে বেলালকে ফোন করে বলি ইটের প্যাকেটগুলো কাঁচপুর ব্রিজের নিচে নিয়ে আসতে। সকাল বেলা হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল কোর্টে নজরদারী শেষে আদমজীনগর ক্যাম্পে ফিরে গিয়েছিল। ওইদিন কোর্টে নজরদারী করার সময় নজরুলের লোকজন সিপাহী তৈয়বকে সন্দেহ করেছিল এবং আটক করেছিল। পরে তৈয়ব পরিচয় দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একটি সাদা মিতসুবিশি মাইক্রোবাসে করে হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল, সৈনিক আরিফ, সৈনিক তাজুল ইটের প্যাকেটগুলো নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর ঘাটে আসে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে রানা স্যারের ট্রলারটি কাঁচপুর ব্রিজের নিচে আসে। ট্রলারটি আসার পর আমি এমদাদকে ইটের প্যাকেটগুলো ট্রলারে লোড করতে বলি। তারপর আমি সিও স্যারকে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে বলি যে, ৭ জনকে গুম করার বিষয়ে আমি প্রস্তুত। ওইসময় সিও আমাকে বলেন, ওকে গো এহেড। সিও স্যারের আদেশ পেয়ে আমি নায়েক হীরা, সিপাহী তৈয়বকে বলি যে, মাইক্রোবাসে থাকা ৭ জনকে সাকসা ইনজেকশন পুশ করতে। রানা স্যারের মাইক্রোবাসের লোকজনকে বলি এলাকায় পাহারা দিতে। ইনজেকশন পুশ করার পর নায়েক বেলাল, নায়েক হীরা, সিপাহী তৈয়ব, এসআই পুর্নেন্দু বালা, সৈনিক আলামিন, সৈনিক তাজুল, কনস্টেবল শিহাব ও সৈনিক আলীম এই ৮ জনে আটককৃত ৭ জনের মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে এবং আমাকে অবহিত করে। তারপর আমি সবাইকে ডেড বডিগুলো ট্রলারে লোড করার জন্য বলি। তারপর আমি আমার টিমসহ ট্রলারে উঠি এবং রানা স্যারের টিম ও গাড়িগুলাকে ফেরত পাঠিয়ে দেই। আমরা আনুমানিক ১টার দিকে ট্রলার নিয়ে মেঘনা নদীর মোহনার দিকে রওনা দেই। আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে ট্রলারটি নিয়ে মেঘনা নদীর মোহনায় পৌঁছাই। মেঘনা নদীর মোহনায় পৌঁছিয়ে আমার টিমের সদস্যরা প্রতিটি ডেডবডির সঙ্গে এক সেট ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। নদীতে লাশ ফেলে ফেরত আসার সময় র‌্যাব-এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি অপস) কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে মোবাইলে ফোন করেন। ওই সময় আমি স্যারের ফোন না ধরে আমার সিও স্যারকে ফোন করে বলি যে, স্যার এডিজি অপস স্যার কেন আমাকে ফোন করছেন? তখন সিও স্যার আমাকে বলেন যে, আমি এডিজি অপস এর সঙ্গে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর সিও স্যার আমাকে ফোন করে জানান যে, এডিসি অপস প্রথমে আমাকে ও সিও স্যারকে তার অফিসে যেতে বলেছিলেন। পরে তিনি শুধু আমাকে ও আমার টিমের সদস্যদেরকে তার অফিসে যেতে বলেছেন। রাত অনুমান সাড়ে ৩টার দিকে আমি ট্রলারে করে নারায়ণগঞ্জ ঘাটে এসে পৌঁছাই। ঘাটে পৌঁছে দেখি সিও স্যার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঘাটে সিও স্যারের সঙ্গে কথা বলে ওই সময় র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে রওনা দেই। আনুমানিক রাত ৪টার দিকে আমি এডিজি অপস এর অফিসে পৌঁছাই। অফিসে পৌঁছার পর এডিজি অপস কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে বলেন, আরিফ কি হয়েছে? নজরুল কোথায়? স্যারের প্রশ্ন শুনে আমি একটু অবাক হই। তারপর আমি বলি নজরুল কোথায় আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? তখন স্যার আমাকে আবার ওই একই প্রশ্ন করেন। তখন আমি স্যারকে বলি যে, আমি যা করি সিও এর আদেশে করি। সো এ বিষয়ে যা জিজ্ঞাসা করার আপনি সিও স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন। তারপর এডিসি স্যার সিওকে ফোন দেন এবং ফোনেই সিও স্যারের সঙ্গে আমাকে কথা বলান। তখন আমি সিও স্যারকে বলি যে, স্যার নজরুল কোথায় এই কথা এডিজি স্যার আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছেন। তখন সিও স্যার বলেন যে, এডিজি কেন এমন করছে তা আমি বুঝতেছি না। ঠিক আছে তুমি ঘটনা বর্ণনা করে আস। তারপর আমি সমস্ত ঘটনা এডিজি স্যারকে বলার পর তিনি আমাকে চলে যেতে বলেন। তারপর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমি নারায়ণগঞ্জ এসে সিওকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে বাসায় চলে যাই। ২৮শে এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিও’র সঙ্গে দেখা করে আমি আমার অফিসে যাই। সাড়ে ৩টার দিকে অফিস থেকে বাসায় আসি। ২৯শে এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে অফিসে যাই। ওইদিন ১২টার দিকে সিও স্যার আমাকে ফোন করে বলেন যে, এডিজি অপস স্যার আমাকে ও সিও স্যারকে তার অফিসে যেতে বলেছেন। তারপর আমি ও সিও স্যার র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে রওনা দেই এবং আনুমানিক দেড়টার দিকে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাই। হেডকোয়ার্টারে পৌঁছার পর এডিজি স্যার প্রথমে সিও স্যারের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। তারপর আমাকেও ডেকে পাঠান। তারপর আমাদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়। এডিজি স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে আমি নূর হোসেনের সঙ্গে কি কি কথা বলেছি। নূর হোসেন কতদিন ধরে নজরুলের বিষয়ে ইনফরমেশন দিয়েছে। ব্যাংক বিষয়ে নূর হোসেনের সঙ্গে কি কথা হয়েছে। লাশগুলো কি করেছি? তখন আমি বলি যে নূর হোসেন প্রায় দেড় মাস ধরে নজরুলের বিষয়ে তথ্য দিয়ে আসছিল। আর ব্যাংকের বিষয়ে নূর হোসেনের একজন বিশ্বস্ত লোকের একাউন্ট নম্বর দিতে বলেছিলাম। আর লাশগুলো মেঘনাতে ফেলে দিয়েছি। আমার কথা শেষ হওয়ার পর এডিজি অপস স্যার বলেন যে, আজকের মধ্যে নূর হোসেনকে মেরে ফেলতে হবে। তখন আমি বলি যে, নজরুলের কারণে নারায়ণগঞ্জ গরম হয়ে আছে। এ অবস্থায় নূর হোসেনকে মারলে পরিস্থিতি কন্ট্রোল করা ডিফিকাল্ট হবে। তারপর এডিজি অপস সিওকে বলেন যে, সিও এটা তোমাকে করতে হবে। তারপর আমি ও সিও স্যার নারায়ণগঞ্জে চলে আসি। তারপর সিও স্যার আমাকে ও রানা স্যারকে চিটাগাং রোডে রেকি করতে পাঠান। আনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে সিও আমাকে ফোন করে অফিসে আসতে বলেন। অফিসে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি যে আমাদেরকে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে ক্লোজ করা হয়েছে। রাত ৮টায় হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাই এবং মুভ অর্ডার নিয়ে রাতেই মাতৃবাহিনীতে যোগদান করি। পরের দিন স্ব-পরিবারে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা সেনানিবাস চলে যাই।

রায়ের পর কারাগারের পথে দন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের রায় ঘোষণায় পর দন্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরকে নিয়ে বিভিন্ন কারাগারের উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যায় প্রিজন ভ্যান। প্রতিটি ভ্যানের সঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।

সোমবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টার কিছু সময় পর রায় ঘোষণা শেষে আসামিদের একে একে এজলাস থেকে বের করে কঠোর নিরাপত্তায় প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। এ সময় র‌্যাব, পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।  রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ আদালত চত্বরে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনজীবী ছাড়া অন্য কাউকে আদালত চত্বরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আদালত চত্বরের বাইরে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে সবাইকে তল্লাশি করা হচ্ছে।
৭ খুনের ঘটনায় দু’টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম একসঙ্গে শেষ হয়েছে। একটি মামলার বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল এবং অপরটির বাদী নিহত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। মামলা দু’টির চার্জশিটে ৩৫ জন অভিন্ন আসামি। তাদের মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার, ১২ জন পলাতক রয়েছেন।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন : নাসিকের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মুহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানা, র‌্যাবের সদস্য এসআই পূর্ণেন্দু বালা, এএসআই বজলুর রহমান, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, হাবিলদার এমদাদুল হক, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন, কনস্টেবল বাবুল হাসান, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, বেলাল হোসেন, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, সিপাহী নুরুজ্জামান, সিপাহী আসাদুজ্জামান নূর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী ও আবুল বাশার।

পলাতক আসামিরা হলে : নূর হোসেনের সহযোগী ভারতে গ্রেফতার সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন এবং র‌্যাাবের আট সদস্য কর্পোরাল লতিফুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলী, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আলামিন শরীফ, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএসআই কামাল হোসেন ও কনস্টেবল হাবিবুর রহমান।
ন্যায় বিচার হয়েছে, রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি : সাত খুনের রায়ে ন্যায় বিচার হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করলেন বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন। পাশাপাশি দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান তিনি। সোমবার ( জানুয়ারি ১৬) নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে চাঞ্চল্যকর এই সাত খুনের মামলায় ২৬ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পেয়েছি।’

এছাড়া এই মামলার বিচার হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান উচ্চ আদালতের প্রতি। তিনি বলেন, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় ন্যায়বিচার না পাওয়ার শঙ্কা থেকে নদী থেকে এই লাশগুলো উদ্ধারের পর আমিসহ তিনজন আইনজীবী উচ্চ আদালতে রিট করি। উচ্চ আদালত এই মামলার মূল আসামিদের অন্যতম র‌্যাাবের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতার করে। তার পথ ধরে এই রায়। তিনি অবিলম্বে এই রায় কার্যকরের আহ্বান জানান।

দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম : নিহত নজরুলের স্ত্রী : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলায় রায় ঘোষণার পর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, প্রতিদিনই আমাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ে। এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। কাঙ্ক্ষিত দিনে কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি। এ রায়ের জন্য সরকার ও বিচারককে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চাই না। আমরা এ রায়ের দ্রুত কার্যকর চাই। সেলিনা আরো বলেন, আজো হুমকি আসে। স্বামীর মতো পরিণতি বরণ করতে হবে বলে উড়ো চিঠি আসে। এ রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই।