“যানজট জলযট সীমাহীন দূর্ভোগে মানুষ”

96

“যানজট জলযট সীমাহীন দূর্ভোগে মানুষ”লেখক- হাসিনা মরিয়মঃ  প্রায় সোয়াকোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা মহানগরী এরই মধ্যে বিশ্বের মেগাসিটি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেছে। যানজটসহ নানা সমস্যায় ঢাকা মহানগরী বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় সমস্যাবহুল নগরী হিসেবেও বদনাম কিনেছে। একটুখানি বৃষ্টি হলেই তৈরী হয় জলাবদ্ধতা। শহর ও নগর গড়ে উঠে পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু ঢাকাকে সেভাবে গড়ে তোলা যায়নি। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতে সে সম্ভাবনার কথা ভাবাও দুঃসাধ্য। এ শহরে গতি নেই আছে দুর্গতি। ক্রমান্বয়ে ধীর, স্লথ ও স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকা, হয়ে পড়েছে গতিহীন।

যানজট এখন শুধু রাজধানী নয়, পুরো জাতির জন্য এক বিড়ম্বনার নাম। দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে এ ভয়ংকর সমস্যা। যানজটের কারনে যে সময়ক্ষেপন ঘটছে, অর্থনীতির হিসেবে তার ক্ষতি ভয়াবহ। এই সমস্যা উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। দেশের রফতানি বানিজ্যকে অনিশ্চিত করে তুলছে।বিদেশীরা বাংলাদেশের রাজধানীকে অস্বস্তির দৃষ্টিতে দেখে যানজটের কারনে। বলা যেতে পারে যেসব কারনে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বিঘ্নিত হচ্ছে যানজট তার অন্যতম। রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারনে লোকসান আর ভোগান্তির কোন সীমা পরিসীমা নেই।

ঠিক কতটা অর্থনৈতিক লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, কতটা কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, মানুষ কতটা ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছে এই নিয়ে চলছে গবেষনা, কিন্তু কোন কিছুতেই সফলতা আসছে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় যানজট-জলজটে উপর্যূপরি বিপর্যয়ের উদ্ভব ঘটছে।

সামান্য বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে মানুষ রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এই অবর্ননীয় দুর্ভোগ-দুর্গতির জন্য দায়ী কতিপয় মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকান্ড। বিশেষ করে নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতার অভাব, বর্ষাকালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের জন্য সংস্কার করা রাস্তা খুড়ে লাইন বসানো। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অন্যতম নির্মান  হলো ফ্লাইওভার, এটি নির্মানে যে কর্মযজ্ঞ চলছে, তা যদি ড্রেন ও সড়কগুলোকে ধ্বংস না করতো তাহলে হয়তো জলজট-যানজট এতো ভয়াবহ রূপ নিতো না।
ফুটপাত দখল, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, অপরিকল্পিত আবাসন, প্রাইভেট গাড়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি, রিকশার বেপোরোয়া চলাচল, বিভিন্ন স্থাপনার কারনে এ সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারন করছে।যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনার বেশীর ভাগই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ বছর আগে রাজধানীতে স্থায়ী অস্থায়ী মিলিয়ে লোক সংখ্যা ছিল যেখানে ৭০ লাখ, আজ আনুমানিক প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ এসে ঠেকেছে।

প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের অভিবাসন হচ্ছে ঢাকায়। এতে চাপ বাড়ছে রাজধানীর উপর। নগরীতে যে হারে লোক সংখ্যা বাড়ছে সে হারে আয়তন বাড়েনি। এরপরেও অব্যাহতভাবে নির্মিত হচ্ছে স্কুল,কলেজ বহুতল ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আবাসন।আর এসব স্থাপনার বেশীর ভাগেরই নাই নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা। সরকার যানজট নিরসনে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে ফ্লাইওভার নির্মান করছে। এবং আরো  নির্মানাধীন অবস্থায় আছে। যানজটে সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি পুড়ছে মুল্যবান জ্বালানী সম্পদ। বাড়ছে দূষণ, অপচয় হচ্ছে মানুষের মুল্যবান সময়, দেশের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত মূল্যবান জ্বালানি সম্পদ অপচয় ঘটছে প্রতিদিন, বায়ু ও শব্দ দূষনের কারনে মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যানজটের কারনে সময় মতো গন্তব্যে পৌছানো দূরহ হয়ে পড়েছে ফলে মানুষের কর্মঘন্টা নষ্ট এবং সাময়িক চাপ বৃদ্ধির কারনে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যানজটের কারণে মূমূর্ষ রোগীকে সময়মত হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না।

মূলত রাজধানীকে যানজটমুক্ত ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজধানীর প্রবেশ পথগুলো যানজটমুক্ত রাখতে হবে। বাস পরিচালনা ব্যবস্থা, বাসের জন্য পৃথক লেন, মেট্রোরেল, বৃত্তাকার নৌপথ প্রবর্তন, ফ্লাইওভার নির্মান এবং স্বল্প দূরত্ব রেল সার্ভিস চালু। এছাড়া রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোকে রিকশামুক্ত ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং নগরীতে মানুষের চাপ কমিয়ে আনতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানামা বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে রাস্তার সম্প্রসারণ ও নতুন রাস্তা তৈরী করে রাস্তার ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো, গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো ও এসবের রুট পারমিট দেয়া।

যানজট সৃষ্টির প্রকৃত কারণ বের করতে না পারলে কোনদিনও যানজট সমস্যা শতভাগ বের করা সম্ভব হবে না। আমাদের দেশের যানজট সমস্যাসহ সকল ধরনের সমস্যার সমাধান মূলত নির্ভর করে আমাদের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের উপর। তারা যদি আন্তরিকভাবে চান যে যানজট সমস্যা সমাধান করবেন তবে খুব সহজেই তারা তা করতে পারেন। এক্ষেত্রে দরকার আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার।

ঢাকা একটি পুরনো শহর ৪০০ বছর আগে রাজধানী হিসেবে এর পত্তন। এটি এখন পৃথিবীর মেগসিটিগুলোর অন্যতম, তবে সেটা আকৃতিতে নয় জনসংখ্যায়। ঢাকা শহরের যানজটের জন্য এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। এর জন্য ব্যাপক ভিত্তিক ও স্থায়ী পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আইন শৃংখলা বাহিনীর আন্তরিক তৎপরতা, কাঠামোগত পরিবর্তন, যানজট সমস্যা বহুলাংশে কমাতে পারে। যানজটের জন্য মাত্রাতিরিক্ত অভিবাসনও দায়ী। দেশের প্রতিটি এলাকা থেকে রাজধানীতে আসে মানুষ কাজের খোজে। ঢাকা পুরোপুরি অর্থনৈতিক নির্ভর শহর হয়ে গিয়েছে। সরকারের যেসব পরিকল্পনা তাতে অভিবাসন ঠেকানোর উপায় নেই, সমাধান না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে জনসংখ্যার ঘনত্ব। ঢাকার প্রতি একরে প্রায় ৫০০ মানুষ বাস করে।

যানজট সমস্যার রাতারাতি কোন সমাধান হবে না, যানজট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নিয়ে এ সর্বগ্রাসী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাস্তার তুলনায় যানবাহনের আধিক্য যানজটের জন্য অন্যতম দায়ী। যানজট নিরসনে রাস্তাগুলি প্রশস্তকরন। ব্যাপকভাবে ফ্লাইওভার নির্মান, রাজপথ থেকে হকার উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং এর অবসান এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে গুরুত্বরোপ দিতে হবে।  তবেই হবে ঢাকা একটি তিলত্তমা নগরী।

বিডিসংবাদ/এএইচএস