ঘুরে এলাম বেলজিয়াম

হাসিনা মরিয়ম

429

দ্বিতীয়বার জেভেনতেম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নেমে মনটা ভরে গেল, প্রথমবার যখন বেলজিয়াম এসেছিলাম, আমি দেশে ফেরার এক সপ্তাহ পরেই জেভেলতেম বিমান বন্দরে সন্ত্রাসী হামলা হয়। যখন দ্বিতীয়বার এলাম দেখলাম বিমান বন্দরে তার কোথায়ও কোন চিহ্ন নেই। এখানকার সবাই আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যার যার কাজে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, সময় কোথায় এসব নিয়ে মন খারাপ করার। জীবন তার নিজস্ব গতিতেই চলে, কোন কিছুর জন্য থেমে থাকেনা।

যাই হোক এবারের যাত্রা একটু বড় এবার প্রায় তিন মাস কাটালাম বেলজিয়াম। কারন এবার আমার পরিবারের নতুন মেহমান এসেছে। আমার নাতনী, আমার Angel, ওকে দেখার জন্য আমি বাংলাদেশ থেকে সুদূর বেলজিয়াম ছুটে গিয়েছি। এয়ারপোর্টে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমি বের হয়ে আসলাম। আমার জন্য অপেক্ষা করছে আমার পরিবার আর আমাদের নতুন মেহমান এ্যলাইনা মরিয়ম মোর্শেদ। আমাদের পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য। আমি ওকে দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে গেলাম। ওকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আনন্দে মনটা ভরে গেলো আমার। যেন টুকটুকে একটুকরো ভালবাসা আমাদের সোনামনি।

ও যেন বুঝতে পেরেছে আমি ওর কেউ। একটুও কাঁদেনি ও আমার কোলে এসে, এমনিতে ও অচেনা কারো কাছে যায় না কেঁদে উঠে, কিন্তু আমার কোলে প্রথম এসে সে একটুও কাঁদেনি, ও আমার সাথে মিশে ছিল। তারপর আমরা সবাই রওনা দিলাম তিনানের পথে, বাসায় যেয়ে এতবড় জার্নির ক্লান্তি যেন  নিমিষেই চলে গেল। সেই চিরচেনা আমাদের ডুপ্লেক্স বাড়ী। বাড়ির পিছনে গার্ডেন আমার প্রিয় দোলনা, সব কিছু মিলিয়ে আমার মন ভরে গেল। খাওয়া দাওয়া শেষে আড্ডায় মেতে উঠলাম আমরা সবাই।

মূলত এই দীর্ঘ সময় আমি প্রচুর ঘুরে বেরিয়েছি। শপিং করেছি, এর মধ্যে ছিল এ্যলাইনার চুল কাটার উৎসব এবং আমার ছেলের বউ আমাদের এ্যানির জন্মদিন পালন, এছাড়া আমার সৌভাগ্য হয় পরিবারের সবার সাথে ঈদ করার।

প্রায় রেস্টুরেন্টে আমরা সবাই রাতের খাবার খেতাম, কখনও লাঞ্চ এবং প্রায় বিকালের নাস্তা এবং সাথে  আমার প্রিয় কফি। ভ্রমন উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় নানারকম খাবার খাওয়ার সৌভাগ্য হয় আমার।

তবে সেখানে ওদের নিজস্ব খাবার ছাড়াও মরোক্কান, টার্কিশ, চায়নিজ এবং জাপানিজ খাবার বেশী চোখে পড়েছে। বিশেষ করে টার্কি পিজেরিয়া ইস্তাম্বুল, চিকেন হেক্টর, একজি কফি সপ, হেজেন ডেজ, কুইক, শুশি সপ এবং তিনান আয়দিন ও পিৎজাহাট এবং সিটি-২ এর লাঞ্চ গার্ডেন উল্লেখযোগ্য। তবে আমার ভালো লাগতো যদি আমাদের দেশের রেস্টুরেন্ট সেখানে হতো, হয়তো আছে কিন্তু আমি দেখিনি। যেমন দেখা যায় বিভিন্ন দেশের রেস্টুরেন্ট পর্যাপ্তভাবে।

আমাদের দেশের খাবারের যে বৈচিত্র তা সেখানে তুলে ধরা যেত। কি নেই আমাদের খাবারের তালিকায়। মোগলাই থেকে শুরু করে দেশীয় বিভিন্ন স্পাইসি খাবার বিশেষ করে শুটকি মাছ, ইলিশ মাছ আমাদের দেশের পরিচিতি এনে দিতে পারে বিশ্বদরবারে। বিশেষ করে ভোজন রসিকদের জন্য বিশাল একটা দরজা খুলে যেত। আর আমরাও অর্থনীতিতে লাভবান হতাম। আর একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছে সেটা হলো গার্মেন্টস প্রোডাক্টস। আমরা হয়তো আছি ওখানে তবে আরো বেশী থাকা উচিৎ।

 

সেখানে বাঙালী, ভারতীয় ও নেপালী আমার চোখে পড়েছে। অনায়াসে আমরা আমাদের ঐতিহ্যেবাহী জামদানি শাড়ী ও টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ী তুলে ধরতে পারি। এতে অর্থনীতির সাথে সাথে আমাদের দেশের পরিচিতিটাও বেশী হতো। তাছাড়া থ্রীপিস, কুর্তা,বেডকভার,কুশন কভার এবং ঐতিহ্যেবাহী হস্তশিল্প সেখানে হয়ে উঠতে পারে মিনি বাংলাদেশ। এভাবেই আমরা আমাদের নিয়ে যেতে পারি বিশ্ব দরবারে।

আমাদের চামড়াশিল্প খুব সহজেই সেখানে জায়গা দখল করে নিতে পারে। আমি সেখানে চায়নিজ ব্যাগ দেখেছি। তবে আমি মনে করি আমাদের চামড়াজাত পন্য খুব ভালো একটা জায়গা দখল অরে নিতে পারে সুদূর বেলজিয়াম। যাই হউক বৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দর একটা দেশ বেলজিয়াম। প্রকৃতি যেন সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে,  এরা জাতি হিসেবে শান্তিপ্রিয় এবং পরিশ্রমী।

ছুটির দিনগুলোতে এরা পরিবারের সাথে সময় কাটায়। এবার আমি ওসট্যান্ট সীবীচ, লুভেন গ্র্যান্ড প্লেস, ব্রাসেলস রয়াল প্লেস, গ্র্যান্ড প্লেস, হেললেএস কেসেল লো লুভেন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য জায়গায় গিয়েছি। আরো অনেক জায়গায় গিয়েছি প্রকৃতির কাছাকাছি। যতই দেখেছি ততই  মুগ্ধ হয়েছি।

বেলজিয়ামের সীবীচ সুন্দর, আমরা অনেক এনজয় করেছি। লুভেন বিশ্ববিদ্যালয় খুব সুন্দর। লুভেন স্টুডেন্টদের শহর। এখানে বেশীরভাব স্টুডেন্ট সাইকেল ব্যবহার করে। লুভেনকে সাইকেলের শহরও বলা যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অবস্থিত। ব্রাসেলসে রাজবাড়ী দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বেশীভাগ শপিং করেছি সিটি-২ মার্কেট ও ইনোতে। ট্রেন,ট্রাম, বাস সময়ের ব্যপারে খুব পাংচুয়াল, ছবির মত সুন্দর ঘরবাড়ি, যেদিকে তাকাই প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে বেলজিয়ামকে। অত্যান্ত সচেতন ও সুশৃঙ্খল জাতি এরা। কিভাবে যেন দীর্ঘ সময় কেটে যায় আমার পরিবারের সাথে আমার এ্যলাইনার সাথে।

দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আমি দেশের উদ্দেশ্যে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে রওয়ানা হই। দেশে ফিরে এসেও আমার মন পরে থাকে ছোট্ট সোনামনি এ্যলাইনার কাছে।

বিডিসংবাদ/এএইচএস