‘জেনোসাইড’ বলতে কী বোঝায়?

55
১৯৭১ সালে পাক সেনাদের হামলার ভয়ে দেশ ছাড়ছে পূর্ব পাতিস্তানিরা (পরবর্তী বাংলাদেশ)। ছবি: সংগ্রহীত।

মালয়েশিয়ার সরকার ও অ্যাক্টিভিস্টরা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার অভিযোগ এনেছে৷ মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে৷

জেনোসাইড – এই ‘টার্ম’ বা শব্দটি প্রায়ই আলোচনায় আসে৷ কোন ঘটনাকে জেনোসাইড বলা হবে, কোনটিকে নয়, কিসের ভিত্তিতেই বা এর সংজ্ঞায়ন হয়, সেই সব বিষয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন জার্মান ইতিহাসবিদ বরিস বার্থ৷ ২০০৬ সালে জেনোসাইডের ইতিহাস নিয়ে তার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে৷

ডয়চে ভেলে: ‘জেনোসাইড’ শব্দটি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

বরিস বার্থ: পোলিশ-ইহুদি আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে প্রথম ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেন৷ আউশভিৎস ক্যাম্পে ইহুদিদের উপর যে ধরণের নির্যাতন চালানো হচ্ছিল তার বর্ণনায় ‘অ্যাট্রোসিটি’ বা ‘নির্মমতা’ শব্দটি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে হয়েছিল তার৷ হলোকস্ট ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক অপরাধ, যার জন্য নতুন ‘টার্ম’ বা শব্দের প্রয়োজন ছিল৷ ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের কনভেনশনে ‘জেনোসাইড’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়৷

বর্তমানে জেনোসাইড টার্মটি নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে গেলে বিভিন্ন ভাষায় জেনোসাইড শব্দের ব্যবহারের বিষয়টি জানতে হবে৷ জার্মানি ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, যদি ইচ্ছে করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা করা হয় তাহলে সেটি ‘জেনোসাইড’ বলে বিবেচিত হতে পারে৷ তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শব্দটি আরও বড় পরিসরে ব্যবহৃত হয়৷ সেখানে এমন ঘটনাকেও জেনোসাইড বলা হয় যেই ঘটনায় হয়ত কেউ প্রাণ হারায়নি৷ আবার অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দেখুন, সেখানে যখন কর্তৃপক্ষ আদিবাসী শিশুদের তাদের মায়েদের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছিল তখন বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছিল৷ সেটি অবশ্যই বর্ণবৈষম্যমূলক অপরাধ ছিল৷ অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজিতে ঐ ঘটনা জেনোসাইড বলে পরিচিত, যদিও তখন কেউ মারা যায়নি৷

কী ধরনের ঘটনা ঘটলে জেনোসাইড হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যায়?

যখন জাতিগত ও ধর্মের কারণে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়৷ একটি দেশ যখন ঘোষণা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় তখন সেটি জেনোসাইড বলে বিবেচিত হতে পারে৷ জাতিসংঘের কনভেনশন তা-ই বলে৷ এই কনভেনশনে অভিযু্ক্ত হিসেবে শুধু দেশের কথা বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি৷

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৮৬ জন প্রাণ হারিয়েছে৷ গৃহহীন হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার জন৷ অক্টোবরের ২৭ তারিখে তোলা এই ছবিতে ঐ রাজ্যের একটি গ্রামের বাজার দেখা যাচ্ছে, যেটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল৷ শিশুরা সেখান থেকে বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করছে৷

জেনোসাইড হয়েছে কিনা তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন কারণ আমাদের এই অপরাধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে৷ একটি দেশ গণহত্যা করছে কিনা তা যাচাই করতে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে৷

‘জাতিগত নিধন’ শব্দটি সংজ্ঞায়িত করাও কি কঠিন?

এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নিধন বিষয়টি সংঘাতপূর্ণ নাও হতে পারে৷ জাতিগত কারণে কোনো দেশে একটি গোষ্ঠীকে অযাচিত মনে হতে পারে৷ অবস্থা সে রকম হলে ঐ গোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে পুনর্বাসিত করা হতে পারে৷ কিংবা সেটি খুবই বর্বরও হতে পারে, যা গণহত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে৷ আসলে সীমারেখা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়৷ তবে ইতিহাস বলছে, জাতিগত নিধন অনেক সময় গণহত্যা পর্যন্ত গড়িয়ে থাকে৷ ডিডব্লিউডি