সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ কোথায়?

562

মীর আহম্মেদ মীরু: ক্ষমতাসীন দলের মুষ্টিমেয় ব্যক্তির আগ্রাসী ভূমিকা, পুলিশের বেপরোয়া আচরণ আর অহেতুক হামলা-মামলায় ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে সাংবাদিকতা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পড়ে আবার পরিস্থিতির শিকার হয়ে কখনো কখনো অকাতরে প্রাণ দিতে হচ্ছে তাদের। সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গত ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের সামনেই সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হন দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে মারা যান তিনি।

এই ঘটনার কয়েকদিন আগে ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর শাহবাগে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন এটিএন নিউজের প্রতিবেদক কাজী এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরাপারসন আবদুল আলিম। এ ঘটনার রেশ না যেতেই গত শুক্রবার সন্ধ্যায় একই থানা পুলিশের হামলার শিকার হন চিত্রসাংবাদিক জীবন আহমেদ। এর আগে গত বছরের ৬ নভেম্বর চকবাজারের দেবীদাস লেনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন যমুনা টিভির রিপোর্টার শাকিল হাসান ও ক্যামেরাপারসন শাহীন আলম। প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলছে। আক্রান্ত সাংবাদিকরা কখনো পঙ্গু হচ্ছেন আবার কখনো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। এই কাতারে বাংলাদেশেই গত দুই দশকে যোগ হয়েছে ৩৮ সংবাদকর্মীর নাম। এসব ঘটনার হাতেগোনা দুই-একটির সুরাহা হলেও বাকিগুলো রয়ে গেছে অন্ধকারে।

২০১৪ সালে বাংলাদেশে ১১ জনসহ গত এক দশকে সারা বিশ্বে ৭০০ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার কারণেই তাদের পরিকল্পনা করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু যথাযথ তথ্য–প্রমাণের অভাবে কিংবা রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকায় এসব হত্যাকাণ্ডের ৯০ ভাগেরই কোনো তদন্ত হয়নি। গত বছরের ২ নভেম্বর ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি অবসানে আন্তর্জাতিক দিবস’ (ইন্টারন্যাশনাল ডে টু অ্যান্ড ইমপিউনিটি ফর ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট জার্নালিস্টস) উপলক্ষে দেয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেসকো)। ওই বছর ৩০ অক্টোবর অপর এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার যথাযথ বিচার না হওয়া এটাই প্রমাণ করে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো অপরাধ করেই পার পাওয়া যায়।

সর্বশেষ তাজা সব খবরের আপডেট পেতে বিডিসংবাদ ফেসবুক ফ্যান_পেজ এ  লাইক দিয়ে এক্টিভ থাকুনক্লিক করুন

রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হচ্ছেন তাই নয়, স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদদের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী চরমপন্থিদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, এমনকি খুন হচ্ছেন সাংবাদিকরা। ‘সমকাল’-এর ফরিদপুর জেলা সাংবাদিক গৌতম দাস ২০০৫-এর ১৭ নভেম্বর তার কার্যালয়ে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। ২০০৪-এর ১৫ জানুয়ারি ‘সংবাদ’-এর খুলনা প্রতিনিধি মাণিক সাহা আততায়ীর বোমার আঘাতে নিহত হন। একই বছর ২৭ জুন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক জন্মভূমি’ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু এবং ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর  খুলনা ব্যুরো চিফ শেখ বেলাল উদ্দিন নিহত হন। বগুড়া থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দুর্জয় বাংলা’র বার্তা সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন ২০০৪-এর ৩ অক্টোবর। ‘দৈনিক আজকের কাগজ’-এর মাণিকছড়ি প্রতিনিধি কামাল হোসেন খুন হন ২০০৪-এর ২২ আগস্ট। শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূবালী বার্তা’র সম্পাদক সৈয়দ ফারুক আহমেদ ২০০২-এর ৩ আগস্ট নিহত হন। খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূর্বাচল’ এর সাংবাদিক হারুনুর রশিদ খোকন নিহত হন ২০০২-এর ২মার্চ। একই বছর খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’-এর সাংবাদিক সরদার শুকুর হোসেন নিহত হন। ২০০১-এর ২০ জুলাই ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আহসান আলী নিহত হন। ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এর বিশেষ প্রতিনিধি শামসুর রহমান যশোরে নিজ কার্যালয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ২০০০-এর ১৬ জুলাই। ১৯৯৯-এর ১৩ মার্চ নিহত হন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক লোকসমাজ’-এর রফিকুল ইসলাম রফিক। যশোর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক রাণার’ সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল নিহত হন ১৯৯৮-এর ১২ জুন। একই বছর একই দিনে নিহত হন চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দিনবদল’-এর স্টাফ রিপোর্টার বজলুর রহমান এবং সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সাংবাদিক খন্দকার রেজাউল করিম। উল্লেখ্য ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সম্পাদক এসএম আলাউদ্দিনও আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ।সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে সমকালের প্রতিনিধি শিমুল আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের কোন্দলের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

বিগত ১০ বছরের মধ্যে প্রতিবছরই বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬৬ জন। সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন বস্তুনিষ্ঠতার শপথ নিয়েই। রাজনীতিবিদদের নষ্ট মানসিকতা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্প্রসারণ সাংবাদিক পেশাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিবিসি’র সাংবাদিক উইলিয়াম ক্রলি ও মার্ক টালিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বহিষ্কার করা হয়েছিল। যে সব দেশে গণতন্ত্র নেই যেমন মধ্যপ্রাচ্য, চীন, লিবিয়া,মিয়ানমার,পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নেই। গণমাধ্যমগুলো জনগণের চাহিদানুযায়ী খবর পরিবেশন করতে পারে না। আবার কিছু দেশে গণতন্ত্র থাকলেও স্বাধীন সাংবাদিকতা মেনে নিতে পারেন না সে সব দেশের নোংরা রাজনীতিবিদরা। অবস্থাটা এমন যে তথ্য গোপন করে তারা যুগের পর যুগ ক্ষমতা আকড়ে থাকবেন। একুশ শতকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে তথ্য গোপন রাখার কোনো সুযোগ যে নেই সেটা তারা বুঝতে চান না। তারপরও যখন তারা সে চেষ্টা করেন এবং সাংবাদিকরা সেই অপচেষ্টা রোধ করে তখন তাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে সাংবাদিকদের ওপর।

সর্বশেষ তাজা সব খবরের আপডেট পেতে বিডিসংবাদ ফেসবুক ফ্যান_পেজ এ  লাইক দিয়ে এক্টিভ থাকুনক্লিক করুন

সম্প্রতি বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা বেড়ে গেছে। কিন্তু জাতির বিবেক গণমাধ্যম কর্মীদের দুর্ভাগ্য যে,এসব হত্যাকান্ডের কোনোটিরই সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচার হচ্ছে না।  গত এক দশকে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক হত্যাকান্ডের বিচার কাজ এখনো ঝুলে রয়েছে। কয়েকটি মামলার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা,মূল অপরাধীদের পাশ কাটিয়ে চার্জশিট দেয়া,দুর্বল অভিযোগ উত্থাপন এবং চার্জশিটভুক্ত আসামিদের গ্রেফতার না করার অভিযোগ আছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১৭ সাংবাদিক। তাদের মধ্যে একাধিক জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিকও রয়েছেন। তবে কোনো হত্যাকান্ডের কথা বলা হয়নি আসকের ওই প্রতিবেদনে।

সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) ২০১৬ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে, বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যায় দায়মুক্তি বা বিচার এড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়। সিপিজের ওই প্রতিবেদনে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক হত্যার বিচার এড়ানো দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১তম বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগের বছর বাংলাদেশ ছিল ১২তম স্থানে। সিপিজের বিবেচনায় অবস্থার অবনতি ঘটেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অন্তত সাত সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির কথা বলা হয়।

সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন। জাতির বিবেক। প্রতিদিন সংবাদ পিপাসু মানুষের দ্বারে নতুন নতুন খবর নিয়ে হাজির হয় সাংবাদিকরা। তাদের লেখনি বা সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে সকালে চায়ের কাপে ঝড় থেকে শুরু করে মানুষ সুফল পেতে শুরু করে। নির্যাতিত মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে সাংবাদিকদের দারস্থ হয়। আর সাংবাদিকরা জাতির সামনে তুলে ধরে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সুখ,দুঃখ,হাসি কন্না,সাফল্য ব্যার্থতার কথা। কিন্তু সেই সাংবাদিক যখন নির্যাতিত হয় তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

লেখক: সম্পাদক বিডিসংবাদডটকম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন

বিডিসংবাদ/আতে