আটলান্টিকের উভয় পাশে করপোরেট ডার্ক মানির প্রভাব যেভাবে

42

জর্জ মনবিও: ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মেনে নিতে করপোরেট আমেরিকা কিছুটা সময় নিয়েছিল। অনেক ব্যবসায়িক নেতা তো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে অনেকের পছন্দ ছিল ট্রেড ক্রুজ বা স্কট ওয়াকার। কিন্তু ট্রাম্পের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে যাওয়ায় করপোরেট আমেরিকা অভূতপূর্ব সুযোগের সন্ধান পেতে শুরু করে।

ট্রাম্প শুধু সরকারের মধ্যে করপোরেশনের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চান না, বরং সরকারকেই এ ধরনের করপোরেশন বানাতে চান, যার কর্মচারী ও পরিচালক হবেন এক্সিকিউটিভ ও লবিস্টরা। এই অসামঞ্জস্য ব্যবসায়ীদের জন্য দারুণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এ সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য এরই মধ্যে কিছু আমেরিকান করপোরেশন একটি ‘ডার্ক মানি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছে।  যুক্তরাষ্ট্রে ডার্ক মানি বলতে বোঝায়, পলিটিক্যাল অ্যাডভোকেসিতে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে তহবিল দেয়া; কারণ অর্থ কোথা থেকে এল, তা বলতে এ প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য নয়। শুধু গুটি কয়েক লোক মনে করতে পারে যে, একটি টোব্যাকো কোম্পানি জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারে অথবা একটি কয়লা কোম্পানি জলবায়ু পরিবর্তনের নিরপেক্ষ মন্তব্যকারী হতে পারে। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নিমিত্তে এ কোম্পানিগুলোকে তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য অবশ্যই অন্যদের অর্থ দিতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পর নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে আমেরিকার কয়েকজন সর্বোচ্চ ধনী থিংকট্যাংকের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি শুরু করেন। থিংকট্যাংকের মূল কাজ হলো, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সামনে নিয়ে আসা। কিন্তু এখন তারা পরিণত হয়েছেন করপোরেট লবিস্টে, যারা তাদের অর্থ দেন, তারা তাদের হয়েই কাজ করেন।

‘ডার্ক মানি নেটওয়ার্ক’ কীভাবে পরিচালনা করে, এটি যদি আমরা বুঝতে না পারি তাহলে আমাদের দিকে কী ধেয়ে আসছে, তা বোঝার আশা করতে পারি না। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক সদস্যের ‘অসাধারণ’ গল্প আমাদের আটলান্টিকের উভয় পাশের এ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে দারুণ ধারণা দিতে পারে। এ সদস্যের নাম লিয়াম ফক্স। ছয় বছর আগে নিজের ব্যক্তিগত ও সরকারি স্বার্থের মধ্যে মিশেল ঘটিয়ে ধরা খাওয়ার পর ডিফেন্স সেক্রেটারির পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয় লিয়ামকে। এর পর মনে হয়েছিল, ফক্সের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আজ তিনি রয়েছেন সামনের সারিতে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে— সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড।

১৯৯৭ সালে, যে বছর টনি ব্লেয়ারের কাছে কনজারভেটিভরা পরাজিত হয়, ফক্স (যিনি কনজারভেটিভ পার্টির ডান হাত) আটলান্টিক ব্রিজ নামের একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। এ সংস্থার উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন আগামী দিনের ক্যাবিনেট মন্ত্রী মাইকেল গভ, জর্জ অসবর্ন, উইলিয়াম হেগ ও ক্রিস গ্রেলিং। ব্রেক্সিটের অন্যতম প্রধান প্রচারক ফক্স আটলান্টিক ব্রিজের মিশন সম্পর্কে বলেছিলেন, একই ধরনের স্বার্থ রয়েছে এমন মানুষদের একজোট করা। তারা এসব স্বার্থ রক্ষা করবে ইউরোপিয়ান ইন্টেগ্রেশনিস্টদের হাত থেকে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়।

পরবর্তীতে আটলান্টিক ব্রিজ নিজেদের নিবন্ধন করে একটি দাতব্য সংস্থা হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল যুক্তরাজ্যের নিজের ডার্ক মানি নেটওয়ার্কের একটি অংশ। শুধু সংস্থাটি ধসে যাওয়ার পরেই এটি কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার পুরো গল্প আমরা জানতে পারি। এর প্রধান স্পনসর ছিলেন অতিশয় ধনী মাইকেল হিনটেজ। সিকিউএস নামের হেজ ফান্ড প্রতিষ্ঠা করার আগে তিনি গোল্ডম্যান স্যাকসে কাজ করতেন। কনজারভেটিভ পার্টির সবচেয়ে বড় ডোনারদের মধ্যে একজন ছিলেন হিনটেজ। ২০১২ সালে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং পলিসি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে, যেটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞানের ওপর সন্দেহের তীর ছুড়ে দেয়। পাশাপাশি আটলান্টিক ব্রিজকে নগদ অনুদান এবং ঋণও দেন। হিনটেজ তার নিজের প্রাইভেট জেট ফক্সকে ধার দিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে যাওয়া-আসার জন্য।

আটলান্টিক ব্রিজের আরেক প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজা। আটলান্টিক ব্রিজের গ্যাবি বার্টিন নামের একজন গবেষককে কোম্পানিটি অর্থ দিয়েছিল। গ্যাবি বার্টিন পরবর্তীতে ডেভিড ক্যামরনের প্রেস সেক্রেটারি হয়েছিলেন এবং এখন তিনি হাউজ অব লডর্সের সদস্য।

২০০৭ সালে আমেরিকান লেজিসলেটিভ এক্সচেঞ্জ কাউন্সিল (অ্যালেক) নামের গ্রুপ একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান খোলে, যার নাম দি আটলান্টিক ব্রিজ প্রজেক্ট। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালেক হচ্ছে সবচেয়ে বিতর্কিত করপোরেট অর্থায়নকৃত থিংকট্যাংক। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি স্টেট ও ফেডারেল আইনপ্রণেতাদের এবং করপোরেট লবিস্টদের একজোট করে ‘মডেল বিলস’ তৈরি করার জন্য। আইনপ্রণেতা ও তার পরিবার এ গ্রুপের কাছ থেকে অঢেল আতিথেয়তা উপভোগ করে এবং এর বিনিময়ে যাওয়ার সময় ‘মডেল বিল’ সঙ্গে করে নিয়ে যায় প্রচারণা চালানোর জন্য, যেন এগুলো তাদের নিজেদেরই উদ্যোগ।

অ্যালেক দাবি করেছে যে, প্রতি বছর তাদের এক হাজারের বেশি ‘বিল’ আইনপ্রণেতারা উপস্থাপন করেন এবং পাঁচটির মধ্যে একটি আইনে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটিকে প্রচুর অর্থ দেয় টোব্যাকো কোম্পানি, তেল কোম্পানি এক্সন, ওষুধ কোম্পানি এবং চালর্স অ্যান্ড ডেভিড কক। এ দুই বিলিয়নেয়ার প্রথম টি-পার্টি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফাইজা, যা আটলান্টিক ব্রিজে বার্টিনের পদে অর্থায়ন করেছিল, তারা অ্যালেকের করপোরেট বোর্ডের সদস্য। সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে বিতর্কিত আইনগুলো যেমন— ন্যূনতম মজুরি কমানোর স্টেট বিল, করপোরেশনগুলোকে প্রসিকিউশন থেকে রেহাই দেয়ার বিল এবং ‘এগ-গ্যাগ’ আইন (যা কারখানার চাষচর্চায় অনুসন্ধান চালাতে বারণ করেছে) তৈরির পেছনে কাজ করেছে অ্যালেক।

আটলান্টিক ব্রিজের যুক্তরাষ্ট্রের শাখা পরিচালনার জন্য অ্যালেক নিয়ে আসে তাদের ডিরেক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস— ক্যাথরিন ব্রে-কে।  ব্রে একজন ব্রিটিশ নারী, যিনি এর আগে কাজ করেছেন কনজারভেটিভ এমইপি রিচার্ড অ্যাশওয়ার্থ ও ইউকিপ এমইপি রজার হেলমারের জন্য। পরবর্তীকালে ব্রে কাজ করছেন কনজারভেটিভ এমইপি ও ব্রেক্সিট ক্যাম্পেইনার ড্যানিয়েল হান্নানের জন্য। তার স্বামীর নাম ওয়েলস গ্রিফিথ, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ছিলেন ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটস ডিরেক্টর।

আটলান্টিক ব্রিজের যুক্তরাষ্ট্রের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন কট্টর ও রক্ষণশীল সিনেটর জেমস ইনহফ, জন কিল এবং জিম ডিমিন্ট। খবর বের হয়েছে যে, ইনহফ প্রচারণার জন্য কয়লা ও তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পেয়েছেন। কক ইন্ডাস্ট্রিজ ও এক্সনমবিল— উভয়ই এর প্রধান ডোনার।

অবসর নেয়া কিল এখন দায়িত্ব পালন করছেন ‘শেরপা’ হিসেবে। সিনেটের মাধ্যমে ট্রাম্পের অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার জন্য জেফ সেসনসকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য জিম ডিমিন্ট সিনেট থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। হেরিটেজ ফাউন্ডেশন একটি থিংকট্যাংক, যা কোরস ব্রিউং সাম্রাজ্যের জোসেফ কোরসের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান থেকে প্রতিষ্ঠিত এবং ব্যাংকিং ও তেল বিলিয়নেয়ার রিচার্ড মেলোন স্কেইফের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে গড়ে উঠেছে। অ্যালেকের মতো এটিতেও প্রচুর অর্থ দিয়েছে কক ভাইরা। কংগ্রেস যেন ফেডারেল বাজেট ব্লক (আটকে) করে দেয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য হেরিটেজ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, সে সময় এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডিমিন্ট। এ ব্লকের জন্য ২০১৩ সালে সাময়িকভাবে সরকারের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফক্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা, যিনি একজন মার্কিন, নাম লুক কফি— এখন এ ফাউন্ডেশনের জন্য কাজ করছেন।

এ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এখন ট্রাম্প প্রশাসনের মূলে আসন গেড়েছে। ট্রাম্পের ‘ট্রানজিশন টিমের’ বৃহদাংশ জুড়ে রয়েছেন এ ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য, ফেলো ও স্টাফরা। এদের মধ্যে রয়েছেন— রিবিকা মার্সার, যার ঠাঁই হয়েছে ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে; স্টিভেন গ্রোভস ও জিম ক্যারাফানো (স্টেট ডিপার্টমেন্ট); কার্টিস দোবে (ট্রেজারি) এবং এড মিস, পল উইনফ্রি, রাস ভোয়ট ও জন গ্রে (ম্যানেজমেন্ট ও বাজেট)। সিএনএন এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘এ ট্রানজিশনে আর কোনো ওয়াশিংটন সংস্থার এমন ধরনের পদচিহ্ন নেই।’

ফেডারেল ব্যয় ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার কমানোর যে অস্বাভাবিক পরিকল্পনা ট্রাম্প নিয়েছেন, এর খসড়া করেছে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। তারা এটিকে বলছে, ‘একটি নতুন প্রশাসনের জন্য প্রতিচিত্র’। ভোয়ট ও জন গ্রে, যারা হেরিটেজ থেকে এসে ট্রাম্পের দলে যোগ দিয়েছেন, তারা এখন এ প্রতিচিত্রকে ট্রাম্পের প্রথম বাজেটে রূপ দেয়ার কাজ করছেন।

এটি পাস হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, ফিন্যান্সিয়াল রেগুলেশন ও পরিবেশগত সুরক্ষার তহবিল বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের কবলে পড়বে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও শিল্পকলায় তহবিলের জন্য যে প্রকল্পগুলো রয়েছে, তা বাদ পড়বে এবং করপোরেশন ফর পাবলিক ব্রডকাস্টিংকে বেসরকারীকরণ করা হবে। এ নিবন্ধন অনুসরণ করলে আপনি বুঝতেই পারছেন, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট কম মনে হবে আর বেশি মনে হবে দালাল (মধ্যস্থতাকারী), যিনি তার হাতে তুলে দেয়া এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে ট্রেড সেক্রেটারি হওয়ার পর পরই লিয়াম ফক্স ওয়াশিংটনে উড়ে যান। সেখানে প্রথম যেসব জায়গায় তিনি যান, তার মধ্যে একটি ছিল এমন, যেখানে গত ১৫ বছরে তিনি প্রায়ই এসেছেন— হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের অফিস। এখানে তিনি অন্যদের পাশাপশি জিম ডিমিন্টের সঙ্গে আলোচনা করেন। ফ্রিডম অব ইনফরমেশনের কল্যাণে প্রকাশ পেয়েছে যে, ওই বৈঠকে আলোচনা করা টপিকগুলোর মধ্যে একটি ছিল ক্লোরিনে পরিষ্কার করা আমেরিকান মুরগির ওপর ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা। উৎপাদকরা প্রত্যাশা করছেন যে, একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্য এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। পরবর্তীতে ফক্স ডিমিন্টকে লেখেন, আমরা নিরাপত্তাসহ যেসব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে আলোচনা করেছি, সেগুলোসহ যুক্তরাজ্যের নতুন সরকার নিজেদের যে বাণিজ্যনীতি সম্পর্কিত অগ্রাধিকার তৈরি করেছে, সে পরিপ্রেক্ষিতে আপনার সঙ্গে কাজ করতে উন্মুখ হয়ে রয়েছি।

ওই স্ক্যান্ডালের পর— যা তাকে ২০১১ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল— কীভাবে ফক্স এই পর্যায়ে আসতে পারলেন? এ সম্পর্কে ওই স্ক্যান্ডালটিই একটি ক্লু দিচ্ছে: এটি ছিল সরকারি ও বেসরকারি স্বার্থের মধ্যকার সীমানা অতিক্রম করার বিষয়। যে ব্যক্তি আটলান্টিক ব্রিজের যুক্তরাজ্যের শাখা পরিচালনা করতেন, তিনি ছিলেন ফক্সের বন্ধু অ্যাডাম ওয়ারেটি, যিনি মাইকেল হিনটেজের অফিস বিল্ডিং থেকে এটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। অ্যাডাম ওয়ারেটির কাজ ডিফেন্স সেক্রেটারি ফক্সের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ওয়ারেটি যে বিজনেস কার্ড বহন করতেন, তাতে তার পরিচয় ছিল ফক্সের উপদেষ্টা, অথচ মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স কখনই তাকে নিয়োগ দেয়নি। ওয়ারেটি সেক্রেটারি অব স্টেটের (ফক্স) সঙ্গে বহু বৈদেশিক সরকারি সফরে গেছেন এবং তিনি ফক্সের অফিসে প্রায়ই আসতেন।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ সম্পর্কের বিস্তারিত ক্রমান্বয়ে প্রকাশ হতে শুরু করে। চ্যারিটি কমিশন আটলান্টিক ব্রিজের বিষয়ে তদন্ত করে এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, এ সংস্থার কাজ ঠিক দাতব্যের মতো নয়। সংস্থাটি যে কর অব্যাহতি (হিনটেজ বিলটি তোলে) পেয়েছিল, তা তাদের দিতে হয়। এর উত্তরে ট্রাস্টিরা সংস্থাটি বন্ধ করে দেন। সরকারের কাজে ওয়ারেটির অননুমোদিত সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরো বিস্তারিতভাবে সামনে আসতে শুরু করলে ফক্স বেশকিছু বিভ্রান্তিকর বিবৃতি প্রদান করেন। কিন্তু ফক্সের কাছে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

যখন টেরিসা মে আবার ফক্সকে তার সরকারে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন, তখন তার সরকারের অভিপ্রায় সম্পর্কে আমরা একটি শক্তিশালী সংকেত পাই। ফক্স যে বাণিজ্য চুক্তিগুলোর দায়িত্বে, তা সার্বভৌমত্বের সীমা তৈরি করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও পরিবেশগত মান ব্রিটেনের তুলনায় কম হতে থাকে এবং যদি ট্রাম্প তার কাজ করতে পারেন তাহলে এটি আরো নিচে নামবে। আমরা যে বাণিজ্য চুক্তিই করি না কেন, তা পণ্য ও সেবার জন্য একটি সাধারণ মান তৈরি করবে। ট্রাম্পের প্রশাসন আমাদের মানসীমা সমন্বয় করে নিচে নামানোর দাবি করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনগুলো নিজেদের পণ্য ঠিক করা ছাড়াই আমাদের বাজারে প্রবেশ করতে পারে। ব্রেক্সিট ভোটের পর এখন সব কার্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে: যদি যুক্তরাজ্য সহযোগিতা না করে তাহলে কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হবে না।

টেরিসা মের এমন একজনের প্রয়োজন ছিল, যিনি প্রতিরোধ করবেন না। তাই তিনি ফক্সকে পছন্দ করলেন, যিনি এখন মের দলের অপরিহার্য সদস্য। আটলান্টিক ব্রিজের মাধ্যমে যে ছায়া কূটনৈতিক মিশন ফক্স তৈরি করেছিলেন, তা সরাসরি তাকে ট্রাম্প প্রশাসনে প্রবেশ করিয়েছে।

ট্রাম্পের জয়ের বহু আগে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচারণায় তহবিল প্রদান ধারাক্রমে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দূষিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নতুন বিশ্লেষণ, কংগ্রেস নির্বাচনের জন্য দুই দলের সংগৃহীত অর্থ ও ভোটে তাদের ভাগের মধ্যে একটি প্রায় নিখুঁত রৈখিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে, যা ৩২ বছর ধরে ছিল। কিন্তু কয়েক বছরে এ ধারায় পরিবর্তন এসেছে। এখন তহবিলের অধিকাংশই জোগাচ্ছেন করপোরেট দাতারা।

যুক্তরাষ্ট্রের এদের সঙ্গে আমাদের ভাগ্য জড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরকার আমাদের এ সিস্টেমের সঙ্গে বেঁধে ফেলছে। ব্রেক্সিট যে কারণে হয়েছে, এটি তারই অংশ: জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী ইউরোপীয় আইনগুলোকে কনজারভেটিভ ইউরো সংশয়বাদীরা চিত্রিত করেছেন করপোরেট স্বাধীনতার ওপর অসহনীয় অনুপ্রবেশ হিসেবে। ইউরোপের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়ার অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করা। এই ট্রান্স-আটলান্টিক বিশেষ সম্পর্ক আদতে রাজনীতি ও করপোরেট শক্তির মধ্যকার একটি বিশেষ সম্পর্ক। লিয়াম ফক্সের সাহায্যে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কগুলো এ শক্তি দৃঢ় করেছে।

১৯৩৮ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে এ সতর্কতা বার্তাটি দিয়েছিলেন: ‘একটি গণতন্ত্রের স্বাধীনতা তখন নিরাপদ থাকে না, যদি একটি পর্যায় পর্যন্ত মানুষ বেসরকারি শক্তির উত্থানকে সহ্য করে, যে পর্যায়ে এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়ে অধিকতর ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এটি হলো ফ্যাসিবাদ।’ আমরা ভালো করব যদি এ সতর্কতা বার্তা মনে রাখি।

লেখক: কলামিস্ট, প্রতিষ্ঠাতা, দ্য ল্যান্ড ইজ আওয়ারস