নদী সংরক্ষণে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে এই ছবি : তৌকীর আহমেদ

ইমপ্রেস টেলিফিল্মের বহুল আলোচিত ছবি ‘অজ্ঞাতনামা’ মুক্তি পেয়েছিল গত বছর ১৯ আগস্ট। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন তৌকীর আহমেদ। চলচ্চিত্রটির মুক্তি উপলক্ষে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ফ্রান্সের প্যারিসে এক প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়।

85

আহাম্মেদ ফরিদঃ

‘জয়যাত্রা’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ও ‘অজ্ঞাতনামা’র পর এবার ‘হালদা’ নামের একটি ছবি পরিচালনা করতে যাচ্ছেন অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী ও হালদা পাড়ের মানুষদের ঘিরেই এর গল্প। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে ছবিটির চিত্রায়ন। এর আগে বিডি সংবাদের মুখোমুখি হয়েছেন তৌকীর। পড়ুন তার সাক্ষাৎকার-

বিডি সংবাদ : হালদা নদী নিয়ে চলচ্চিত্র কেনো?
তৌকীর আহমেদ :
 একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, বিষয় বৈচিত্রের ক্ষেত্রে আমার প্রতিটি ছবি আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপটে নির্মিত। সেরকম ‘হালদা’ও একটি সুভিত্তিক চলচ্চিত্র হবে। আপনারা সবাই জানেন, হালদা একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। এটি চট্টগ্রামের একটি নদী। ফটিকছড়ি থেকে শুরু হয়ে কর্ণফুলীর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। এখানে কার্প জাতীয় মাছ এসে ডিম পাড়ে। সহস্র বছর ধরে মানুষ সেই ডিম সংগ্রহ করে। এই হালদা পাড়ের মানুষের জীবন, তাদের জীবনের প্রতিকূলতা, হাসি-কান্না, বেদনা এবং বিপন্ন হালদার গল্প হচ্ছে আমাদের এই চলচ্চিত্র। আশা করি, ছবিটি দর্শককে ভাবাবে, তারা হালদা নিয়ে ভাববেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাববেন। যদি আমাদের প্রচেষ্টাটি তাদের ভালো লাগে আমরা মনে করবো, এরপর আরও একটি কাজের জন্য এগিয়ে গেলাম।
বিডি সংবাদ : আপনার এ ছবির সঙ্গে হালদা নদী রক্ষা কমিটি আছে?
তৌকীর :
 হ্যাঁ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া দীর্ঘদিন ধরে হালদা নিয়ে কাজ করছেন। শুধু গবেষণা নয়, হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতিও তিনি। এ ব্যাপারে স্থানীয়ভাবে একটি আন্দোলন তৈরি করেছেন তিনি। নদীটিকে রক্ষা করার ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই কার্যক্রম। তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানও আমরা পাচ্ছি। তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। আমাদেরকে নানানভাবে সহযোগিতা করছেন।বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এর মধ্যে হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ারভাটা নদী, যেখান থেকে মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়। এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। এদিক দিয়ে এটা বাংলাদেশের অন্যতম নদী। চার প্রজাতির মাছ এ নদীতে ডিম ছাড়ে- রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ। এসব প্রজাতির মাছ বাঁচিয়ে রাখতে হলে হালদাকে সংরক্ষণ করতে হবে। সুনজর আর যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে দিনে দিনে এই নদী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।আমি তো মনে করি, সুন্দরবন ও কক্সবাজারের পর হালদা দেশের তৃতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। এই নদীকে কেন্দ্র করে এর দুই পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। এপ্রিল থেকে জুন মাসে অমাবস্যার পূর্ণিমায় মা মাছ ডিম ছাড়ে। পর্যাপ্ত ডিম না পাওয়া গেলে দুই পাড়ের মানুষদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। পর্যাপ্ত ডিম পেলে সারাবছর তাদের আনন্দে দিন কাটে। তাই এ নদীর তুলনা হয় না। কিন্তু দূষণের মাধ্যমে নদীটাকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। ৩০-৪০ কিলো ওজনের মা মাছগুলোকে নিধন করা হচ্ছে।এ নদীর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চট্টগ্রামে যে ৬০ লাখ মানুষ বসবাস করে তাদের লাইফ লাইন। কারণ চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিদিন ৯০০ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে হালদা থেকে। সুতরাং হালদা যদি বাঁচে চট্টগ্রামের মানুষ বাঁচবে, হালদা না বাঁচলে চট্টগ্রামের বাসিন্দারা বিপাকে পড়বে। এজন্য সচেতনতা দরকার। ছবিটি তৈরি হলে সেটা বৃদ্ধি পাবে আশা করি। একই সঙ্গে অন্যান্য নদী সংরক্ষণে তরুণ সমাজ এগিয়ে আসবে।বিডি সংবাদ : এটা প্রামাণ্যচিত্র হয়ে যাবে নাতো!
তৌকীর :
 না। এটা কাহিনিচিত্রই হবে। বলতে পারেন ডকু-ফিকশন। তবে আমরা এমন ডকু-ফিকশন তৈরি করতে চাই যেখানে ডকুমেন্টেশন থাকে, মানুষের জীবন থাকে, জীবনের উদযাপন থাকে। তা না হলে সে ছবি হয়তো সৎ চলচ্চিত্র হিসেবে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করবে না।

বিডি সংবাদ : নদীতে কাজ করা তো কষ্টসাধ্য…
তৌকীর :
 ছবিটি প্রযোজনা করছে আমরা ক’জন। এই সংগঠনের প্রধান এইচএম ইব্রাহীমের কাছে প্রথম হালদার গল্প শুনি। তারই এক বন্ধু আজাদ বুলবুল। তিনিই গল্পটি লিখেছেন। ইব্রাহীম ভাই আমাকে জানান, তিনি এই গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করতে চান। চলচ্চিত্রের প্রতি আমার যে আগ্রহ, ইতিমধ্যে আপনারা তা লক্ষ্য করেছেন। আমার কাছে মনে হয়, বিষয় হিসেবে এটি খুবই আকর্ষণীয়। কেননা নদীর চিত্রায়ন খুব কঠিন। বলা হয় যে, নদী ও নৌকার চিত্রায়ন খুব সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যসাপেক্ষ। আমার প্রথম ছবি ‘জয়যাত্রা’ পুরোটাই ছিলো নৌকার ওপর। সেখান থেকে একটা ভয় ছিলো। আবার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আবার একটি চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। যেখানে একটি অন্য নদী। কিন্তু নৌকা ও নদীর বাঁধ, গ্রামবাংলা এবং নদীমাতৃক বাংলাদেশকে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারিনি।

বিডি সংবাদ : আপনার এ ছবিতে দেশের তুমুল জনপ্রিয় তিন তারকাকে নিয়েছেন। এটা কি বাণিজ্যিক দিক ভেবে?
তৌকীর : 
এটা ঠিক, ছবিটির কলাকুশলীরা এ দেশের প্রখ্যাত সব অভিনেতা-অভিনেত্রী। আমি মনে করি, ভালো অভিনয়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, নুসরাত ইমরোজ তিশাকে নেওয়া। এ ছাড়াও ফজলুর রহমান বাবু, রুনা খান, শাহেদ আলী, দিলারা জামানসহ আরও অনেকে যুক্ত হয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ যে তারা আমাদেরকে সময় দিচ্ছেন এবং আশা করছি তারা চরিত্রগুলোকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলবেন।

বিডি সংবাদ : ছবিটির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন কতোদিন ধরে?
তৌকীর : 
এক বছর ধরেই আমরা এটা নিয়ে নানানভাবে কাজ করছি। হালদা পাড়ে ইতিমধ্যে আমার অনেকবার যাওয়া হয়ে গেছে। শুনলে খুশি হবেন, স্থানীয়রা আমাকে দুপুরে বাসায় নিয়ে খাইয়েছেন। সে হিসেবে আমার মনে হয়, হালদা নিয়ে যারাই কাজ করেছেন, আজাদ বুলবুলের কথাই বিশেষভাবে বলবো। কারণ তিনিই গল্পটি লিখেছেন। সেটার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের চলচ্চিত্রটির ভাবনা এসেছে। সেখান থেকে আমরা স্বাভাবিক কারণেই চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন হয়, সেটা করে আমরা ছবিটি নির্মাণের চেষ্টা করছি। এর পেছনে অনেকের শ্রমটাকে আমার মাধ্যমে ‘হালদা’য় আপনারা দেখতে পাবেন। কিন্তু নেপথ্যে আমার চেয়ে অনেক গুণী মানুষ আছেন যাদের নাম বললাম না।

বিডি সংবাদ : কতোদিন লাগবে ছবিটির কাজ শেষ করতে?
তৌকীর : 
যে কোনো ছবিই অন্তত আট-দশ মাস সময় লেগে যায়। দৈর্ঘ্যের দিক দিয়ে বলবো, এখন বিশ্বব্যাপী উৎসবগুলোর জন্য আমরা যেসব ছবি পাঠাই, সেগুলো ৯০-১০০ মিনিটের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা হচ্ছে, দু’ঘণ্টার বেশি না করলে সিনেমা হল মালিকরা ছবি নিতে আগ্রহী হন না। সেক্ষেত্রে ‘অজ্ঞাতনামা’র বেলায় দুটো সংস্করণ করেছিলাম। একটি ডিরেক্টরস কাট (আন্তর্জাতিক সংস্করণ), আরেকটি হলো সিনেমা হলের জন্য। সেভাবেই এবারও হয়তো দুটো সংস্করণই করবো। এর মধ্যে সিনেমা হলের সংস্করটির দৈর্ঘ্য আড়াই ঘণ্টার কম হবে না।

বিডি সংবাদ : দর্শকদের উদ্দেশে কী বলবেন?
তৌকীর : 
পুরনো কথাই বলবো! আপনারা ‘হালদা’ দেখবেন এবং আমাদের চেষ্টা থাকে, পরিশ্রমের মাধ্যমে যেন ভালোভাবে ছবিটি নির্মাণ করা যায়। সেটি যেন আপনাদের ভালোও লাগে। আমি মনে করি, দর্শকদের যদি ভালো না লাগে তাহলে আমাদের নির্মাণের পুরোটাই অর্থহীন হয়ে যাবে।

বিডিসংবাদ/এএইচএস