“যানজট নিরসনে চাই পরিকল্পিত পদক্ষেপ”

লেখক হাসিনা মরিয়ম

173

হাসিনা মরিয়মঃ  রাজধানী ঢাকা এখন যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাজপথ,গলিপথ, ফুটপাত সর্বত্র একই অবস্থা, দশমিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। ঢাকার যানজট অকল্পনীয় ও ভয়াবহ। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম।

১৯৭১ সালে যেখানে নগরটিতে মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যা ছিল, সেখানে আজ জনসংখ্যা বেড়ে দেড় কোটির ওপরে দাড়িয়েছে। জনসংখ্যার এই নজিরবিহীন বৃদ্ধির ফলে ঢাকা নগর বিশ্বের বৃহৎ অন্যসব প্রধান নগরের তুলনায় বেশী ঘনবসতিপূর্ন শহরে পরিনত হয়েছে। রাজধানীর ক্রমোন্নতি আংশিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করে।  যা বছরে প্রায় ৬ শতাংশেরও বেশী হারে বেড়েছে। তবে উন্নতি হলেও শহরের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ যানজটের  নগরীতে পরিণত হয়েছে। একটি অত্যাধুনিক রাজধানী শহরের  মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ জায়গার প্রয়োজন রাস্তা ব্যবহারের জন্য। সেখানে ঢাকা শহরের যানবাহন চলাচলের জায়গা আছে মাত্র ৭ শতাংশ। আর সাত ভাগ রাস্তার বেশিরভাগ জায়গা বেদখল করে আছে ফুটপাতের দোকান আর অনির্ধারিত জায়গায় পার্কিং। ফুটপাত বেদখল হওয়ার ফলে যানবাহন চলাচলের রাস্তায় চলাচল করছে লাখ লাখ পায়ে হাটা মানুষ। ফলে গাড়ি চলাচলের রাস্তা নেমে এসেছে তিন ভাগের ও কমে। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের তথা ঢাকার রাস্তার প্রশস্ততা  খুব যে কম তাও নয়। বিশ্বের অনেক পুরনো রাস্তাগুলো ঢাকার রাস্তার থেকেও সরু। কিন্তু সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নত এবং সেখানে সবাই আইন মেনে চলে।প্যাডেল চালিত রিকশা যা দখল করে আছে মোট রাস্তার প্রায় ২৭ ভাগ। একটি শহরে গাড়ির নূন্যতম গতি ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিঃমিঃ হওয়া স্বাভাবিক, আবার হকাররা যত্রতত্র ফুটপাত দখল করে নিচ্ছে, যার কারণে মোট রাস্তার আয়তন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।ফলে গাড়ী চলাচলের রাস্তা কমে যাচ্ছে। যেখানে সেখানে বাস, টেম্পো থামিয়ে যাত্রী উঠা নামার ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। নতুন বাড়ী করার জন্য বাড়ির মালিকরা অনেক সময় রাস্তার উপর ইট,বালু, রড,সুরকি ইত্যাদি রাস্তার উপর রেখে বাড়ির কাজ করে। যার ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়।

এক্ষেত্রে জরুরী সরকারকে জনস্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা। যত্রতত্র বাস, টেম্পো থামিয়ে যাত্রী উঠানামা রোধ করা। নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী উঠবে এবং নামবে। বাড়ীঘর বানানোর সামগ্রী নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে, যাতে জনগনের ভোগান্তি  না বাড়ে। যেখানে সেখানে পার্কিং রোধ করতে হবে। বিকল্প রাস্তা বা বাইপাস সড়ক যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। মহাসড়কে পাশে কোন বাজার থাকতে পারবে না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থা রাস্তা খোড়াখুড়ি করে, এতে জনগনের দূর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। এই সংস্থাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে যদি কাজগুলো সমাধান করে তাহলে জনগনের ভোগান্তি কম হয়। এছাড়া তৈরী পোশাক শিল্প ও অন্যান্য শিল্পগুলো ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে স্থানান্তর করলে এদের সাথে জড়িত শ্রমিক কর্মচারী সবাই তাদের পরিবার নিয়ে কর্মস্থলের পাশে বসবাস করবে, ফলে জনসংখ্যা হ্রাস হওয়ার পাশাপাশি যানজটও বহুলাংশে কমে আসবে। আর সবার জন্য ট্রাফিক আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

রাজধানী থেকে জনসংখ্যা স্থানান্তর এবং নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে ঢাকা শহরের যানজট সম্পূর্নভাবে নির্মূল সম্ভব নয়। সরকারের উচিত অত্যান্ত পরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে আনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে তোলা। যানজট সমস্যা আমাদের নিশ্চিত জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা স্বরূপ। তবে গৃহীত বাস্তবিক পদক্ষেপ এই নারকীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরন ঘটাতে পারে। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন করে যত তাড়াতাড়ি যানজট সমস্যার সমাধান করা যায় দেশ ও জাতির জন্য তা মঙ্গল বয়ে আনবে। এক কথায় সময় নষ্ট না করে আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদেরকে রাজধানী ঢাকাকে নতুনভাবে নতুন সাজে একটি যুগপোযোগী আধুনিক রাজধানীর প্রয়োজনীয় কাঠামো প্রদানে সচেষ্ট হতে হবে, আর সচেতনতার মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে আমাদরকে অভিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।

যানজটের কাছে আত্নঘাতী সমর্থন নয়, বরং ধরে নিতে হবে এক ধরনের নাগরিক নীতিবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে যানজট নিরসনে সৃষ্টিশীল উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।

বিডিসংবাদ/এএইচএস