“ইয়াবা সরবরাহে যারা জড়িত,তাদের ছাড় দেওয়া হবে না” : প্রধানমন্ত্রী

কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ  প্রধানমন্ত্রী বলেন,মেখ হাসিনা বলেছেন, মরণ নেশা ইয়াবা সরবরাহে যারা জড়িত,তাদের কখনো ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, কক্সবাজারের একটা বদনাম আছে, এখান থেকে নাকি ইয়াবা পাচার হয়। ইয়াবা পাচার বন্ধ করুন। যারা ইয়াবা পাচারে জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তারা দেশের জন্য অভিশাপ। মাদক মানুষকে ধংস করে। সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। মাদকদ্রব্য থেকে সন্তানদের দূরে রাখার বিষয়ে মা-বাবাকে সতর্ক  থাকতে বলেন।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে রুঁখে দিতে হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। স্বাধীন জাতি ভিক্ষা করতে পারেনা। আমরা ভিক্ষুকমুক্ত জাতি গড়তে চাই। বঙ্গবন্ধু সে লক্ষ্যেই কাজ করেছিলেন। জাতির জনকের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন আমাদের করতে হবে।

শনিবার (৬ মে) বিকাল সাড়ে ৩টায় কক্সবাজার সাগরপাড়ের শেখ কামাল আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অথিতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষের দল। মানুষের ভগ্যোন্নয়নে আমরা কাজ করি। আওয়ামী লীগের হসসয়ে কোন মানুষ নিঃস্ব থাকবে না। গৃহহারা হবেনা কেউ। আমরা প্রতিটি মানুষের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করে চলেছি। নিঃস্ব মানুষদের মাথাগুজার ঠাঁই করতে ‘গুচ্ছগ্রাম’ তৈরী করছি। আশ্রয়হীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার সহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, নৌকা মার্কা জনগনের মার্কা,নৌকায় ভোট দিয়ে দেশে উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের ভাগ্য খোলে যায়। আওয়ামী লীগের মেগা উন্নয়ন কর্মে দেশ এগিয়ে যায়। শুন্য অবস্থায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতা নিলেও আজকে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ন। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ।

ঐতিহাসিক জনসভায় সভাপতিত্ব করেন, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এড.সিরাজুল মোস্তফা। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের পরিচালনায় সভায় প্রধানমন্ত্রীর আগে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন।

দীর্ঘ প্রায় ৫০ মিনিট স্থায়ী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি লুটের সরকার। খুনের সরকার। তাদের সময়ে খুন-গুম ছাড়া কোন উন্নয়ন হয়নি। মানুষের জন্য তারা কোন কাজই করেনি। তারা আজ প্রত্যাখাত। একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপি দেশের উন্নয়ন করেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি দুর্দিনেও নাই উন্নয়নেও নাই। কিন্তু আমি আপনাদের সামনে খালি হাতে আসিনি। অনেক প্রকল্প নিয়ে এসেছি। উপহার এনেছি। যে কাজগুলো ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো উদ্বোধন করেছি। যেগুলো করব, সেগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এই কক্সবাজারে কি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিএনপি নেত্রী জানতেন না। আমি সংসদে তোলার পর উনি বলে দিলেন, যত মরার কথা, তত মানুষ মরে নাই। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কত মানুষ মরলে আপনার তত মানুষ হবে? এরপর আমরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে ছুটে এসেছিলোম। আসার পথে কঠিন অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। রাস্তা ভাঙা ছিলে। এরইমধ্যে এসে সমস্ত দ্বীপাঞ্চল ঘুরে ঘুরে রিলিফ ওয়ার্ক করেছি। তখন পর্যন্ত বিএনপি সরকারের কেউ আসেনি। যখন কুতুবদিয়াতে নামি সেখানে দেখতে পেয়েছিলাম সেদিন লাশের পর লাশ পড়ে ছিল। নেভির লোকজন কোনোভাবে লাশ দাফন করেছিল। সেইদিনই সেনাবাহিনীর একটি দল এসেছিল। প্রত্যেক এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষের লাশ, শিশুর লাশ আমি নিজে দেখেছি। সাপ গরুর লাশ, ছোট্ট শিশুর লাশ ভেসে ভেসে আসছে। সেই বিভৎস দৃশ্য। যতটা পেরেছি মানুষকে সহায়তা করেছি। রিলিফ দিতে এসে হুমকির সম্মুখীন হয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবৈধভাবে যারা ক্ষমতা দখল করে, সংবিধান লঙ্ঘন করে যারা ক্ষমতা দখল করে, তারা জনগণের কথা ভাবে না। তারা ক্ষমতা ভোগ করে আর কিছু এলিটকে লুটপাটের সুযোগ করে দেয়। ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমি শাসক না জনগণের সেবক হিসেবে বাংলাদেশ পরিচালন করব। আমার বাবা দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন, আমি জানি এটা আমার জন্য কঠিন পথ। কারণ এই মাটিতে আমার বাবা-মা-ভাইসহ পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একইদিনে মেজ ফুফুর বাড়ি সেজ ফুফুর বাড়িতে আক্রমণ করে তার স্বামী ছেলেকে হত্যা করেছে, আমার ছোট ফুফুর বাড়িতেও আক্রমণ করে ফুফাকে না পেয়ে ফুফুকে গৃহবন্দি করেছে। এভাবে হত্যাযজ্ঞ চলেছে।

এর আগে সকাল থেকে ঐতিহাসিক জনসভাস্থলে হাজার হাজার মানুষ মিছিল সহকারে যোগদান অব্যাহত রাখে। সমুদ্র জনপদে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশ যেন আস্তে আস্তে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিকেল ঠিক পৌণে ৩টা। পড়ন্ত বিকেল। ঢাকের তালে নেচে-গেয়ে দলে দলে কানায় কানায় ভর্তি হতে থাকে শেখ কামাল আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। চারদিকে ব্যানার ফেন্টুনে ছেয়ে যায়, বজ্র কন্ঠে হাজার হাজার নেতাকর্মীর জয় বাংলা জয় বাংলা শ্লোগান।

ঘড়ির কাটা ঠিক ৩টায়। মঞ্চে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভাস্থলে উপস্থিত সকলেই প্রধানমন্ত্রীকে শ্লোগান আর করতালির মাধ্যমে অভিবাদন জানান। বিকালের শুভ্রতা নিয়ে ঝরে বাদ্যের ঝলকানি। সেই উৎসবে দোল খেলায় জনতার মিছিল, জনস্রোত।
পুরো কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত জনপদ থেকে সদলবলে লোকজন মিলিত হন এই সমুদ্র জনপদের জনসমুদ্রে। নতুন জামা-কাপড়ে সেজে নানা ধর্মের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু কিশোর এমনকি বৃদ্ধরাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এসে যোগ দেন একাত্বের এই বন্ধনে।
বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে গোটা শেখ কামাল আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম চত্বর। নৌকার শ্লোগান আর আওয়ামী লীগের পতাকা তলে সামিল হওয়ার আহবান আর সেই বন্ধন সাড়া তোলে গোটা ঐতিহাসিক সমাবেশ স্থানে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একযোগে ৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৯টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। বিকাল পৌনে ৪টায় সাগরপাড়ের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে এই প্রকল্পগুলো উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

এসময় সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদ ওবায়দুল কাদের, গণপূর্ত মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগ যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রী নিবাস, কক্সবাজার সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবন কাম এক্সামিনেশন হল, কক্সবাজার সরকারি কলেজের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রী নিবাস, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব মহিলা কলেজ, উখিয়া, কক্সবাজার এর দ্বিতল একাডেমিক ভবন এবং মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন উদ্বোধন করেন।

আরো যে ৯টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন, সেগুলো হচ্ছে-কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (১ম পর্যায়) এলজিইডি অংশ এর আওতায় কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলাধীন বাঁকখালী নদীর উপর খুরুস্কুল ঘাটে ৫৯৫.০০ মি. দৈর্ঘ্যরে পিসি বক্সগার্ডার ব্রীজ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কক্সবাজার আইটি পার্ক, এক্সিলাটে এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক নির্মিতব্য মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোঃ (প্রাঃ) লিঃ কর্তৃক নির্মিতব্য কক্সবাজার মহেশখালীতে দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় এসপিএম (ইনস্টলেশন অব সিংগেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্প, নাফ ট্যুরিজম পার্ক, কুতুবদিয়া কলেজের একাডেমিক ভবন এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস ভবন।