উখিয়া টেকনাফের পথে খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার রোহিঙ্গা

বশির আলমামুন, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত থেকে: স্বরণ কালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের উখিয়া টেকনাফ।

মিয়ানমারের আরকান থেকে পালিয়ে আাসা হাজার হাজার রোহিংগা আশ্রয় নিয়েছে টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে। উখিয়ার কুতু পালং থেকে বালু খালী পযন্ত— সড়কের দুই পার্শ্বে মাইলের পর মাইল রোহিংগা নারী,পুরুষ,শিশু ও বৃদ্ধরা অবস্থান নিয়েছে খোলা আকাশের নাীচে। এই মূহুর্তে এখানে দলে দলে রোহিংগা ছাড়া আর কিছু চোখ পড়ছেনা। শুধু মাত্র পরনের কাপড়টা নিয়ে জীবন বাচানোর তাগিদ ৩/৪ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে বাংলাদেশে পৌছেছে। সংশ্লিটরা জানিয়েছে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। গতকাল বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সিমান্তের নাইক্ষংছড়ির তুমব্র এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বিজিবি রোহিঙ্গা অনু প্রবেশ টেকানো শীতিল করেছ। শরনার্থী ক্যাম্প বা বিচ্ছিন্ন ভাবে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পাশে গেলেই তারা দৌড়ে আসে তাদের জন্য কিছু নিয়ে আসা হয়েছ কিনা দেখতে।অনবরত কান্না। ক্ষুধার্ত দৃষ্টি। নাক ও চোখের জলে একাকার। অঝর ধারায় ঝরছে অশ্রু দুর্বল ক্ষীণ কণ্ঠে বিলাপ। ‘আঁততুন ভুখ লাইগ্গে’ (আমার খিদে লাগছে) বলতে বলতেই চোখ মুচছে দু’শিশু। তিন বছরের ছোট্ট জোবায়ের ও চার বছরের রুবিনা। দাদীর কোলে দুই বছরের হাড্ডিসার মোবিনার কান্নায় যেন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। ক্ষুধার্ত তিন অবুঝ শিশুর সেই কান্না থামানোর চেষ্টা নেই পাশে দাঁড়ানো দাদা-দাদীর। তাদের মুখে তুলে দেয়ার মতো কোনো খাবারই নেই ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মালেক ও পঞ্চাশোর্ধ্ব খাদিজার। নিরুপায় মা হাজেরা এক ব্যক্তির ত্রাণের পানিতে ভাগ বসাতে হুড়োহুড়ি করে আহত হয়েছেন। বোতল হাতে পাননি। খালি হাতে ফিরেছেন আগের দিন গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উপোষ থাকা সন্তানদের কাছে।

গতকাল দুপুরে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডের আবু ছিদ্দিক শপিং কমপ্লেক্সের সামনে এ অবস্থায় তাদের দেখা যায়। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী, পুলিশ, ও বৌদ্ধদের তাড়া খেয়ে মংডুর খিলাদংয়ের বাপ-দাদার ভিটা-বাড়ি ছেড়ে এক কাপড়ে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসেন। গত বুধবার শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে ধারের টাকায় পরিবারের ১৯ সদস্য নিয়ে নৌকায় চড়ে টেকনাফে ঢুকেন আব্দুল খালেক। খোলা বিলে অন্য অনেকের সঙ্গে রাত কাটান তারা। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে শাহপরীর দ্বীপে দয়া করে এক স্থানীয় অল্প কিছু খেতে দিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ পথ হেঁটে গতকাল সকালে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে রাস্তার ধারে অন্য অনেকের সঙ্গে অবস্থান নেন। কোনো শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়ার গাড়িভাড়াও নেই। কী করবে তাও জানে না কেউ। মৃত্যুর তাড়া খাওয়া অনিশ্চিত যাত্রায় এখনো অন্ধকারে তারা।

বৃদ্ধা খাদিজা বলেন, আমরা বুধবার সকালে খেয়েছিলাম। তারপর থেকে আর কোনো দানা-পানি পেটে পড়েনি। মায়ের বুকের দুধ না পেয়ে মোবিনা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত। রুবিনা ও জুবাইরকে শান্ত করতে পারছি না। কী দিয়ে এই শিশুদের বোঝাবো। আমরাই তো কান্না ধরে রাখতে পারছি না। সকালে এক লোক ভাত বিতরণ করেছিল। আমার ছেলে ফয়েজ নিতে গিয়ে কষ্ট পেয়েছে। ভাত পায়নি। বউ এক বোতল পানি আনতে গিয়েও পায়নি।

সেখানে প্রতিদিন রুবিনা-জুবাইর-মোবিনাদের ক্ষুধার আর্তনাদ মিলিয়ে যাচ্ছে আরো শত শত শিশুর কান্নায়। নারীর আজাহারি ও চোখের পানি সৃষ্টি করেছে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। বোবা কান্নায় বুক ভাসাচ্ছেন বৃদ্ধরা। পুরুষদের নিরুপায় নির্বাক চাহনি অশ্রুজলে ছল ছল করছে। শিশুর কান্না, নারীর বিলাপ, আহতদের আর্ত-চিৎকারে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে সৃষ্টি হয়েছে এক বিভীষিকাময় হৃদয়বিদারক পরিবেশ। কিন্তু কে শুনে কার আহাজারি। সবারই করুণ দশা। নির্মম নিয়তি। স্বজন ও সব সহায় সম্বল হারিয়েছে। এখন প্রাণটাই বাকি। তা রক্ষার সম্বলও নেই। পানি নেই। খাবার নেই। গোসল নেই। চিকিৎসা নেই। গায়ে নুন জমে গেছে। পরনে ময়লা পোশাক। নাফ পার হতে কয়েকশ’ টাকার ভাড়ায় দালালরা তাদের কাছ থেকে মাথাপিছু হাতিয়ে নিচ্ছে ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে হাতের শেষ সম্বল ক’টি টাকা হারিয়ে তারা সাময়িকভাবে আটকা পড়ছে বিভিন্ন স্থানে। গতকাল উখিয়ার কুতু পালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ষাট কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশে এমন দশায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী দেখা গেছে। প্রতিদিন এভাবে এই স্থানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হচ্ছে। কিছুটা জিরিয়ে ক্যাম্পে ও অন্যান্য স্থানে ছুটছে। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাস্তাঘাটে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা অন্তত দশ হাজার বলে জানান স্থানীয়  স্থানীয় মো. আব্দুল্লাহ। তার শিশু সন্তানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল কয়েকস্থানে ৫০ হাজার খাবার প্যাকেট বিতরণ করেও তা সমুদ্রে ঢিল ছোড়ার মতোই নগণ্য বলে জানান তিনি।

কিছুটা দূরে নোংরা মেঝেতে শুয়ে কাঁতরাচ্ছিলেন মংডুর খিলদাং এলাকার পশ্চিম পাড়ার রেহেনা বেগম (৩০)। নয় মাসের এই গর্ভবতী পড়ে ছিলেন আধমরা হয়ে। গত ঈদের আগের দিন তার স্বামী আবুকে বাড়িতেই মিয়ানমার আর্মির সদস্যরা গুলি করে হত্যা করেছে বলে জানান তিনি। এরপর তার অন্য তিন বোন তাকে ধরে ধরে, কখনও হামাগুড়ি, কখনও দু’বোনের পাঁজাকোলা করে নাফ নদীর তীরে আনেন। কিন্তু নৌকা পারাপারে দালালদের দাবির ১০ হাজার টাকা জোগাড় করতে না পারায় সেখানেই দীর্ঘ সময় পড়ে থাকতে হয়। পরে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার নিয়ে নৌকা পার হন তারা। গতকাল সকালে টেকনাফ পৌঁছাতে পারলেও কোনো খাবার জুটে নি। দু’পা, মুখমন্ডল ও শরীর ফুলে গেছে। তিনি বলেন, বাঁচবো কিনা জানি না। মৃত্যুর চেয়ে বেশি যন্ত্রণায় আছি। কীভাবে শরণার্থী ক্যাম্পে যাবো তাও জানি না।

তাদের পাশেই আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিলেন ছয় মাসের গর্ভবতী ছমিরা (২৪)। তিনি রাখাইন প্রদেশের আকিয়াব জেলার রাচিডংয়ের শিলখালীর বাসিন্দা বাদশা মিয়ার স্ত্রী। গত ২৫শে আগস্ট তাদের শিলখালীপাড়ায় মিয়ানমার আর্মি নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মারা যান ওই এলাকার শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। তখন তাদের সামনেই স্থানীয় আব্দুল মজিদ (২৮), তার স্ত্রী মাসু (২৪), তাদের তিন শিশু সন্তান, মাসুর মা জুলেখা (৪৫), দিল মোহাম্মদ (৫৫), তার ছেলে আজম উল্লাহ (৩০), করিম উল্লাহর স্ত্রী রোবেয়া (৪০), আক্কাস আলী (৩০), আয়েশা (৪৫), বাডু (৪০), নজির আহমদের মা ও কানফুইজ্জার মা মারা যান।
চোখের সামনে এত লোকের মৃত্যু দেখে নিজেরা ছুটে গিয়ে পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নেন। গুলির বৃষ্টিতে প্রাণে রক্ষা পেলেও যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সেখান থেকে ওই দিন রওয়ানা দিয়ে পাহাড়-পর্বত, নদী-খাল, ঝিরি পাড়ি দিয়ে গর্ভবতী ছমিরা ও তাদের স্বজনরা চৌদ্দ দিন হেঁটে গতকাল সকালে টেকনাফ পৌঁছান। মুষলধারে বৃষ্টিতে পাহাড়ে তিনটা মাত্র ছাতার নিচে ১৯ জন আশ্রয় নিয়ে ২৫শে আগস্ট রাত কাটান তারা।

ছমিরা বলেন, মরার ভয়ে পালিয়ে আসছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মরণই এর চেয়ে সহজ। গতকাল বুধবার সকালে চরে এক কেজি চালের ভাত রান্না করে ১৯ জনে ভাগ করে এক মুঠো করে খেয়েছি। এখন ক্ষুধার জ্বালায় মরে যাচ্ছি। গা ব্যথা হয়ে গেছে। শরীর কাঁপছে। পা টলছে। গায়ে জ্বর। কথা বলতে বলতেই তিনি হেলে পড়েন। তাকে ধরে বসিয়ে দেন তার স্বামী বাদশা মিয়া।
বাদশা মিয়া বলেন, জঙ্গলে গাছের পাতা ও নদীর তীরে নোনা পানি খেয়েছি। এতে পথেই অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। গত ১৪ দিনে একবার নদীতে গোসল করেছি। নারীরা তো তাও পারেনি। এখন হাতে কোনো টাকা নেই। খাওয়া নেই। চিকিৎসা নেই। এখানে কোনো আত্মীয়ও নেই। কোথায় যাবো কিছুই জানি না।

রাস্তা ও মার্কেট চত্বরে বসে থাকা রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা দেখিয়ে তার অবস্থার কথা বলে এক পর্যায়ে তিনি এই প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, ‘সাব, আঁরার মতো নির্যাতিত কউম কী দুনিয়াত আছে (আমাদের মতো নির্যাতিত জাতি কী পৃথিবীতে আছে)? কিয়া কি আঁরর লাই কিছু নগরিব (কেউ কী আমাদের জন্য কিছু করবে না)? আমরা কী এভাবে মরি যাইয়ম গই (আমরা কী এভাবেই মরে যাবো)?।

তার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেখা গেল ফেরদৌস নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী কিছু পানির বোতল নিয়ে আসেন। মুহূর্তেই যেন তিনি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তার পেছনে দীর্ঘ লাইন। ছুটছে পিছু। একটি বোতল নিতেই তা গ্রহণের জন্য উপরে উঠে শত শত অনাহারীর হাত। কাড়াকাড়ি, হুড়াহুড়ি। দেয়ার আগেই ছোঁ মেরে নিচ্ছে। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় ৮০টি বোতল। একইভাবে শেষ হয় ২৪০ প্যাকেট বিস্কুট। আর ওরস্যালাইন বিতরণ করতে গিয়ে তা সম্ভবই হয়নি। অগত্যা ভিড়ের বাইরের দিকে প্যাকেটগুলো ছিটিয়ে দিয়ে ভিড় থেকে বের হয়ে আসেন তিনি।

এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া হাজার হাজার অনাহারী নারী, শিশু, বৃদ্ধের করুণ দশা দেখে ঠিক থাকা যায় না। তাই প্রতিদিন কিছু কিছু দেয়ার চেষ্টা করছি।

চৌদ্দ দিন হেঁটে মংডুর গদুপাড়া থেকে গতকাল পরিবার নিয়ে টেকনাফ আসেন মোহাম্মদ নুর ও সেতারা দম্পতি। তাদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।  গোলাগুলির সময় দুই বছরের ওমর ও ৫০ দিনের মেয়েকে নিয়ে পালানোর সময় কোল থেকে পড়ে যায়। এতেই তার মৃত্যু হয়। এরপর বাংলাদেশে পৌঁছে হারিয়ে যায় অপর একমাত্র ছেলে সন্তান হামিদ হোসেন (৯)। পরিবারের ছবি নিয়ে মা সেতারা বিলাপ করছিলেন, ‘ও পুত মরি গেলি গইদেনে (ও আমার ছেলে কেমন মারা গেলি)।

উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় রাস্তার পাশে একটি শিশু বাচ্ছা কুলে নিয়ে কাদঁছিলেন রইজা খাতুন নামে ষাটউর্ধ্ব এক মহিলা। তিনি জানালেন তার বাড়ি আরকানের রাফিদং এলাকার শীলখালী গ্রামে। তার চোখের সামনে ৩০০ বড়ি ঘর   আগুন দিয়ে পড়ে দেয় ৭০ জন নারী পুরুষ কে হত্যা করে মিয়ানমার আর্মি ,পুলিশ ও বৌদ্ধরা। রাতের অন্ধকারে পাড়ায় ঢুকে  ধর্ষন ও জবাই করে হত্যা করা হচ্ছে নারী পুরুষকে। এদৃশ্য দেখে নিজ কন্যা , জামাতা ও নাতনী কে নিয়ে খালি খাতে তিন দিন তিন রাত পায়ে হেটে সীমান্ত পার হন।

নাইক্ষংছড়ির তুমব্র সিমান্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেখা হল রোহিঙ্গা নেতা আরিফ আহমদ ও দিল মোহাম্মদের সাথে । আরিফ জানালেন তার একটি নোহা ও একটি কার গাড়ি ছিল । মিয়ানমার আর্মি ও পুলিশ হঠাৎ তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাড়িটি ও নোহা গাড়িটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এসময় তারা সহায় সম্বল ফেলে প্রান ভয়ে এপারে চলে আসে।

পুরো টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা জুড়ে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। একটু সহানুভূতির অন্বেষণে হাত পাতছে তারা।