‘ওমিক্রন’ ঠেকাতে দ. আফ্রিকার সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ বন্ধ হচ্ছে

বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ

করোনাভাইরাসের নতুন ‘উদ্বেগজনক’ ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের বিস্তার বাংলাদেশে ঠেকাতে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য শনিবারই ঢাকা ছেড়েছেন বলে যানা যাচ্ছে। যাওয়ার আগে তার দফতর থেকে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক অডিও বার্তা থেকে একথা জানা গেছে।

শুক্রবারই করোনাভাইরাসের নতুন ‘সবচেয়ে খারাপ ও উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ধরণ’টির কথা প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যার নাম দেয়া হয় ওমিক্রন। ভ্যারিয়েন্টটির বিপুলসংখ্যক মিউটেশন রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্বেগের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৪শে নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার খবর জানতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মালেক অডিওবার্তায় বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটি সম্পর্কে আমরা অবহিত হয়েছি। এই ভ্যারিয়েন্টটি অত্যন্ত আগ্রাসী, সে কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যোগাযোগ স্থগিত করা হচ্ছে।’

অন্যান্য দেশ থেকে যারা আসবেন তাদের স্ক্রিনিংয়েও যেন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, সে বিষয়ে সব বন্দরগুলোতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

পাশাপাশি মানুষকে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে তাগিদ দেয়ার জন্য সব জেলা পর্যায়ে প্রশাসনের কাছে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যবিধি মানতে বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের এই নতুন ভ্যারিয়েন্টকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর নাম নির্ধারণ করে ওমিক্রন।

বলা হচ্ছে পূর্ববর্তী ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় এই ভ্যারিয়েন্টে মিউটেশনের সংখ্যা অনেক বেশি এবং এই ভ্যারিয়েন্ট ভ্যাকসিন-লব্ধ সুরক্ষা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি এমনও ধারণা করা হচ্ছে যে এই ভ্যারিয়েন্টটি আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবার শনাক্ত হওয়া এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে এখনো যেহেতু বিস্তারিত কিছু জানা যাচ্ছে না, কাজেই আপাতত বাংলাদেশ শুধু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

শুক্রবার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক এবিএম খুরশিদ আলম বলেন, “ভাইরাস যখন ছড়াতে থাকে তখন যত বেশি ছড়ায়, যত বেশি জায়গায় যায় – এর তত বেশি মিউটেশন হয় এবং তত বেশি রোগ তৈরি করার ক্ষমতা পায়।”

‘এর থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হলো ভাইরাস না ছড়াতে দেয়া। না ছড়াতে দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রধান পদক্ষেপ স্বাস্থ্যবিধি মানা, মাস্ক পরা। এ ফলে অন্তত ৫০ ভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।’

তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, সেরকম কোনো পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আরো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান খুরশীদ আলম।

‘ইউরোপে অনেক জায়গায় লকডাউন দিচ্ছে, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করছে – আমরা সেরকম কোনো পদক্ষেপ নেবো কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।’

অবশ্য আলম এই বক্তব্য দেয়ার একদিন পর শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করার কথা জানান।

খুরশিদ আলম তার শুক্রবারের বক্তব্যে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করার বিষয়টিতে জোর দেন।

“বিদেশ থেকে যারা আসবে, তাদের ভ্যাকসিন দেয়া আছে কিনা, সাম্প্রতিক ভাইরাল স্টাডিটা করেছে কিনা, ভ্যাকসিন দিয়ে থাকলে তার যথাযথ সনদপত্রটা আছে কিনা – এই বিষয়গুলো আপাতত শক্তভাবে কার্যকর করার চিন্তা করতে হবে।”

বাংলাদেশে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছিল করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে। এর আগে আলফা ও বেটা ভ্যারিয়েন্টও শনাক্ত হয়েছিল বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ যারা করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সেঁজুতি সাহা- যিনি বলছেন ভ্যারিয়েন্ট যেমনই হোক না কেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।

সেঁজুতি সাহা বলছিলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটা সদ্যই পাওয়া গেছে, আর এটা নিয়ে যে খুব বেশি গবেষণা হয়েছে, তাও নয়।’

‘ভ্যারিয়েন্ট যেটাই হোক, কোভিড ঠেকাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাস্ক পরা, আর তারপর প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করা।’

স্বস্তির মনোভাব হতে পারে ঝুঁকির কারণ
গত কিছু দিন ধরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্তের হার বেশ কমে এসেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির মনোভাব চলে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এসব কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে অবহেলা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পাশাপাশি তুলনামূলক কম পরিমাণ ভ্যাকসিন দেয়ার কারণেও করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক সাইদুর রহমান মনে করেন, ভ্যাকসিন যে হারে দেয়া হয়েছে তাতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ঢুকে পড়লে আবার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘আমাদের জনসংখ্যার ৩০-৩৫ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এই অবস্থায় কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণ ঘটলে আমরা সংকটের মধ্যে পড়বো।’

‘অনেক দেশেই ৮০-৯০ ভাগ মানুষ ভ্যাকসিনেটেড হওয়ার পরও দেখা গেছে যে নতুন ওয়েভ দেখা গেছে। সুতরাং আমি মনে করি এই বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সতর্কতা নেয়া প্রয়োজন।’
সূত্র : বিবিসি

বিডিসংবাদ/এএইচএস