কক্সবাজারে ঘুর্ণিঝড় মোরার আঘাতে লবণ মিল ও লবণ চাষীর কোন ক্ষতি হয়নি

কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ  কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকার ঘূণিঝড় মোরার আঘাতে মাঠ পর্যায়ের লবণ মিল মালিক ও লবণ চাষীরা কোন প্রকার ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। একটি অসাধু-চোরাই সিন্ডিকেট পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে লবণ এনে বাজার সয়লাব করার চেষ্টা করছে। এছাড়াও শক্তিশালী সিন্ডিকেট মোরার আঘাতে মাঠ পর্যায়ের লবণ মিল মালিক ও লবণ চাষীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মর্মে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে ভুল তথ্য দিয়ে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত লবণ আমদানি করার জন্য ইতোমধ্যে পায়তারা শুরু করেছে।

চোরাইপথে আনা লবণ ও শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত লবণ দেশের উৎপাদিত লবণ থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি করে এই জেলার লবণ চাষীদের ক্ষতিরমুখে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। কক্সবাজার জেলার সাত উপজেলা নানাভাবে জড়িত ছিল ৫ লাখ মানুষ ও চট্টগ্রামের একমাত্র বাঁশখালী উপজেলা ২০ হাজার একরের বেশি জায়গা লবণ চাষে ৫০ হাজারেরও অধিক লবণ-চাষি জড়িত ছিল।

কক্সবাজারের বিসিক লবণ শিল্প উন্নয়ন প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গেল মৌসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) এই জেলার প্রায় ৬১ হাজার ১২৫ একর জমিতে ১৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যা দেশের মোট চাহিদার চেয়ে ৮০ হাজার মেট্রিক টন বেশি। দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ১৭ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন।

বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোঃ আবসার উদ্দিন জানান, ১ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ২২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি লবণ উৎপাদিত হয়েছে। যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

গত বছর জেলায় প্রায় ৬০ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয়েছিল ১৬ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন।

এ কর্মকর্তা আরও জানান, গোটা কক্সবাজার জেলায় ৫৫ হাজার প্রান্তিক চাষিসহ লবণ উৎপাদন ও বিপণনে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ জড়িত ছিল।
কিন্তু বরাবরে মতো চোরাই পথে এবং শুল্কমুক্ত লবণ আমদানির পায়তারার অংশ হিসেবে কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি রইচ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি প্রকাশ করার পর খোদ লবণ মিল মালিক ও চাষীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তাদের মধ্যে গত ৩০ মে ঘুর্ণিঝড় মোরার আঘাতে লবণ শিল্পে কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এরপরেও সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রচার নতুন কোন ফায়দা লুটার অংশ বলে দাবী করা হয়।

লবণ মিল মালিকরা বলেন, কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সভাপতি রইচ উদ্দিন কোন সভাপতি নন। এধরনের সংগঠনের সভাপতি হলেন সামশুল আলম আজাদ। রইচ উদ্দিনের কোন লবণ মিল বর্তমানে নেই। কোন এক সময় মহেশখালী মাতার বাড়ি এলাকায় আলিফ সল্ট ক্রাসিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামে নামমাত্র মিল ছিল। কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭ কোটি টাকা নেন আলিফ সল্ট ক্রাসিং ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক রইচ উদ্দিন। তার ভাই মো. জমির উদ্দিন জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ২ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ৪৭৭ টাকা নিয়ে আত্মসাত করায় তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হলেও কৌশলে রইচ উদ্দিন মামলা থেকে বাদ পড়েন বলে ওই সময় থেকে অভিযোগ উঠে আসছে।

বর্তমানে আলিফ সল্ট ক্রাসিং ইন্ডাস্ট্রিজ এমনকি তার সংশ্লিষ্ট কোন লবন মিল নেই। বৃহত্তর মহেশখালী, মাতারবাড়ি, ধলঘাটা, বদরখালী, চকরিয়ায়, খুটাখালীতে আলিফ সল্ট ক্রাসিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কোন লবন মিলের অস্থি ত্ব নেই। এছাড়া জেলায় শুধু মাত্র বিসি শিল্প এলাকা সদরের ইসলামপুর ছাড়া কক্সবাজারে কোনস্থানে লবন মিল নেই।
গত ১৩ জুন এই রইচ উদ্দিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠান। এতে তিনি দাবী করেন, বিগত ৩০ মে ঘূণিঝড় মোরার আঘাতে উপকূলীয় এলাকার অন্যান্যদের মত মাঠ পর্যায়ের লবণ মিল মালিক ও লবণ চাষীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও বিপর্যস্থ। এ ব্যাপারে সরকারী সহযোগিতা ও সাহায্য অত্যাবশ্যক হলেও এখন পর্যন্ত কোন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা লবণ চাষী বা মিল মালিকরা পায়নি।

তদুপরি গত ১১ জুন সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে কক্সবাজার ও বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকাগুলো ২/৩ দিন ধরে প্লাবন, ঝড় ও বৃষ্টিপাতের কবলে পড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। যা মরার উপর খড়ার ঘা এর মতো। এবারে সাবধানতামূলক প্রচারণার অভাব ও মানুষের অজ্ঞতার কারণে লোকালয়ের পাশাপাশি লবণ মিল মালিক ও লবণ চাষীদের লবণের মজুদ আবারো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিবৃতিতে তিনি আরো দাবী করেন, ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে বর্তমানে প্রায় ৩০টি লবণ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক লবণ চাষী রাস্তায় বসেছে। এই বিপর্যস্ত অবস্থায় সরকারীভাবে সহায়তা না পেলে লবণ শিল্প,মিল মালিক বা চাষীরা ঘুরে দাড়াতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে বাকী মিল গুলোও পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি দাবী করেন, এমতাবস্থায় জরুরী ভিত্তিতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপকূলীয় লবণ চাষী ও মিল মালিকদের পুনর্বাসনে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে এগিয়ে আসার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

এই সাজানো ভুয়া তথ্য সম্বলিত বিবৃতিটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় পর সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। হঠাৎ করে এধরনের মিথ্যা বিবৃতি নিয়ে খোদ জেলা প্রশাসনেও তোলপাড় চলছে। জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় লবণ মিল ও চাষীদের ক্ষতির ব্যাপারে কোন তথ্য নেই। কারণ লবণ শিল্পে কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

টেকনাফের সাবরাং অঞ্চলের প্রান্তিক চাষী মোঃ আবদুচ ছালাম অভিযোগ করে বলেন, গুটিকয়েক মিল মালিক জোট বেঁধে সরকারের একটি দালাল চক্রের যোগসাজশে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে ভুল তথ্য দিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করার তোড়জোড় শুরু করেছে।
ইসলামপুরের বেশ কয়েকজন লবণ মিল মালিক বলেন, কথিত সভাপতি রইচ উদ্দিন সহ  ইসলামপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের কিছু প্রভাবশালী মিল মালিক একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতি বছরই তারা শুল্কমুক্ত লবণ আমদানি করে আসছিল। অনেকে লবণ মামদানির পারমিট নিয়ে চড়া দামে বিভিন্ন মিল মালিককে বিক্রি করারও নজির রয়েছে। ফলে বার বার লবণের ন্যার্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে জেলা প্রান্তিক চাষীরা।