গত ১৫ বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া

হিমালয় থেকে মাত্র ৫৩১ কিলোমিটার দূরে এবং এর আশেপাশে ১০টি আন্তঃসীমান্ত নদী বেষ্টিত এক সময়কার অবহেলিত উত্তর ঠাকুরগাঁও জেলায় সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। প্রত্যন্ত এই অঞ্চলটির প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগ সরকার পরপর তিন মেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামোসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে।
এক সময় দুঃস্বপ্নের লোডশেডিং ছিল জেলার একটি সাধারণ ঘটনা, কিন্তু গত ১৫ বছরে এখন জেলা জুড়ে শতভাগ বিদ্যুতের আওতা নিশ্চিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঠাকুরগাঁওয়ে উৎপাদিত ১০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বর্তমান সরকারের বহুমুখী উদ্যোগের ফলে, ইতোমধ্যেই বিদ্যুতকেন্দ্র ও জাতীয় গ্রিড থেকে নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে জেলার শত শত মানুষকে বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁও জেলায় মাত্র ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল, সে কারণে মাত্র ৬০ শতাংশ মানুষ তখন বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়েছে। বর্তমানে জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ১০৪ মেগাওয়াট। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবস্থাপক (অপারেশন) জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২ মেগাওয়াট হলেও পিক আওয়ারে চাহিদা থাকে ১১৪ মেগাওয়াট। তবে চুক্তি অনুযায়ী, ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা পুরো ঠাকুরগাঁওয়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটায়।
প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পশুপালক অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবার পরিবর্তনকারী হিসাবে আবির্ভূত হওয়ায় জেলাটিতে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঠাকুরগাঁও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে এখন এ জেলায় তেমন কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম নেই।
একসময় বিএনপির আমলে জেলার রানীশংকৈল উপজেলায় ছিল জঙ্গি আস্তানা। ফলে এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তবে রানীশংকৈল এখন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক জানান, জেলায় জঙ্গিবাদের ৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় মোট ৯৪ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বাকি ছয়টি বিচারাধীন রয়েছে। এদের মধ্যে ৭৪ জন জামিনে আছেন, দুইজন পলাতক, দুইজন জামিন পেয়ে পলাতক, পাঁচজন মারা গেছেন এবং একজন খালাস পেয়েছেন এবং পাঁচজন পঞ্চগড় ও রংপুর কারাগারে রয়েছেন। পাঠক আরো বলেন, বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে কোথাও সন্ত্রাসীদের গুপ্ত আশ্রয় বা আস্তানা নেই।
জেলাটি শতভাগ ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঠাকুরগাঁও’কে শতভাগ ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে মোট ৮ হাজার ১৮৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে ৭ হাজার ৪৩৬ জনকে জমিসহ ঘর দেওয়া হয়েছে। বাকি ঘরগুলো নির্মাণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সুবিধাভোগীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
জেলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে অনেক নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ জেলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও এম ওয়াজেদ মিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং সরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ এবং স্কুল-কলেজে ওয়াই-ফাই সংযোগ প্রদান করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আধুনিক ও ডিজিটাল সুবিধা পেতে পারে।
কৃষি উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ :
ঠাকুরগাঁও কৃষি উৎপাদনে দেশের অন্যতম প্রধান অবদানকারী। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে জেলায় ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, শাকসবজি, সরিষা, চাইনিজ বাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, গোলমরিচ, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন ধরনের রেপসিড ও তৈলবীজের চাষ হয়। বর্তমান সরকারের বহুমুখী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনার ফলে গত ১৫ বছরে জেলার মোট আবাদি জমি ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। তাছাড়া পরিবহন ব্যবস্থা সহজ এবং কৃষিপণ্যের দামও লাভজনক হওয়ায় এ জেলার কৃষকরাও খুশি। এ প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই জেলাটি একটি কৃষিনির্ভর জেলা হওয়ায় এখানকার ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষ কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাই কৃষিতে এ জেলার অবদান অনেক বেশি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি শিক্ষা, নিয়মিত যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কৃষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের কারণে জেলাটি গত ১০-১৫ বছরে একটি কৃষিবিপ্লব ঘটে গিয়েছে। কৃষির এই উন্নতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষিতে আরও এগিয়ে যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই কৃষিবিদ।

বিডিসংবাদ/এএইচএস