চট্টগ্রামে জালে ধরা পড়ছে প্রচুর ইলিশ,পল্লীতে জেলেদের খূশির আমেজ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে এখন কোনো জেলে খালি হাতে ফিরছে না। জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে প্রচুর রুপালি ইলিশ। এ কারনে গত কয়েকদিন থেকে চট্টগ্রামের জেলে পল্লীতে চলছে আনন্দের বন্যা। চট্টগ্রামের ফিশারী ঘাট, সদরঘাট, হালিশহর এলাকার কাট্টলি ঘাটে ও সীতাকুন্ডের কুমিরা সহ প্রতিটি ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে ইলিশভর্তি নৌকা নিয়ে সাগর থেকে ফিরছে জেলেরা। ছোট-বড় সব আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ঘাটে। বাজারে দাম ও মোটামুটি ভালো। তাই কষ্ট হলে ও খুশি আমরা। এ কথা বললেন কুমিরা ঘাটঘর জেলেপাড়ার বাসিন্দা বাবুল জলদাশ। মাছ ধরাই বাবুলের একমাত্র পেশা। তিনি বলেন, আমরা (জেলেরা) বছরের ৯ মাস কষ্ট করে চলি। বাকি তিন মাস (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ইলিশের ভর মৌসুম। এ সময় সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। তাই জীবনের ঝঁকি নিয়ে আমরা মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে চলে যাই। যদি সাগরে আশানুরুপ মাছ পাই তাহলে জেলেদের কষ্ট সার্থক হয়।

মওসুমে এ ইলিশ বিক্রি করে জেলেরা সারা বছরের জন্য সঞ্চয় জমা করে রাখে। কিন্তু এ বছর মৌসুমের প্রথম মাস জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সীতাকুন্ড ও স›দ্ধীপ চ্যানেলে তেমন কোনো ইলিশ ধরা পড়েনি। ফলে আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যদি আগস্ট মাসে ও ইলিশ ধরা না পড়ত তাহলে ঋণ করে সংসার চালাতে হতো সবাইকে। তবে ভগবানের অশেষ মেহেবাণী গত চার-পাঁচ দিন প্রচুর ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। বাবুল আরো বলেন, একবার সাগরে গিয়ে আমরা ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার ইলিশ পাচ্ছি। প্রতিটি নৌকায় তিন থেকে চারজন জেলে থাকি। এই টাকা সমান ভাগ করে নিই। অর্থাৎ একবার সাগরে গেলে ছয় থেকে সাত হাজার টাকার ইলিশ পাচ্ছি। এভাবে দিনে ও রাতে দুইবার মাছ ধরলে এক দিনে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে।
বাবুলের সঙ্গে একমত দক্ষিণ কাট্টলি জেলেপাড়ার মানিক জলদাশ। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগেও আমরা ইলিশ নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু চার দিন প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসছে জালে। দামও পাচ্ছি ভালো। সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। একদম ছোট সাইজের ইলিশ ১৫০-২০০ টাকা কেজি, তার চেয়ে বড়গুলো ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মাঝারি ইলিশ ৪০০-৫০০ এবং বড়গুলো পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে কেজি ৭০০-৮০০ থেকে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কিংবা আরো বেশি বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে উপজেলার সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত সর্বত্রই প্রচুর রুপালি ইলিশ ধরা পড়ছে।

মঙ্গবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ফিশারীঘাট, সদরঘাট, কাট্টলীঘাট, কুমিরা-সন্দ্বীপ ঘাটঘরে প্রচুর মানুষ ইলিশ কিনতে জেলে নৌকাগুলোর কাছে ছোটাছুটি করছে।
চট্টগ্রামের খুলশির ক্রেতা মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘শুনেছি এখানে ঘাটে সস্তায় টাটকা ইলিশ পাওয়া যায়। তাই ইলিশ কিনতে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছি। এখান থেকে দুই ঝাঁকা ইলিশ (আনুমানিক ২০ কেজি) পাইকারিতে কিনলাম সাড়ে তিন হাজার টাকায়। এর মধ্যে সাত থেকে আট কেজির মতো ছোট ইলিশ। অন্যগুলো বড়, মাঝারি আকৃতির।

হালিশহর বি ব্লকের বাসিন্দা আবুল কালাম সেলিম জানান এবারে কাট্টলি ঘাটে প্রচুর ইলিশ মাছ এসেছে দামও কম আছে। তাই এক সাথে অনেক ইলিশ কিনেছি।

কাজিরদেউরি ব্যাটারি গলির বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা আয়েশা বেগম জানান প্রচুর ইলিশ ধরা পড়া ও কম দামে  পাওয়ার খবর পেয়ে নগরীর ফইল্যাতলী বাজারে গিয়ে আড়াই হাজার টাকায় মাঝারী সাইজের ১০ কেজি ইলিশ কিনেছি। তবে কাজিরদেউরি বাজারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা মাঝারি সাইজের ইলিশের দাম নিচ্ছে কেজিতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। শহরের ভেতরই বিশাল ব্যবধান।

বাঁশবাড়িয়া বোয়ালিয়া কূলের জেলে ও উপজেলা জেলে সমন্বয় পরিষদের সভাপতি উপেন্দ্র জলদাশ বলেন, সাগরে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। আগামী অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোতে (মাছ ধরার সময়) আরো বেশি ইলিশ ধরা পড়বে বলে তিনি মনে করেন। এই জেলে নেতা আরো বলেন, এবার ভালো দিক হলো, এখন পর্যন্ত কোথাও জলদস্যুতার খবর মেলেনি। সাগরে কোস্ট গার্ড নিয়মিত টহল দিলে জেলেরা নিশ্চিন্তে ইলিশ ধরতে পারবে।

এ ছাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, এবার প্রথম দিকে ইলিশ না পড়লেও গত কয়েক দিনে পূর্ণিমার জো থেকে ইলিশ পড়তে শুরু করেছে। জেলেরা প্রচুর ইলিশ পাচ্ছে। তবে বেশির ভাগই সাইজে কিছুটা ছোট। এখন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইলিশ আরো বাড়বে বলে ধারণা করছেন তিনি।