নারায়ণগঞ্জে রেলওয়ের জমিতে দখলদারদের রামরাজত্ব

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে রেলওয়ের দখল করা জমি এখন পৈতৃক সূত্রে মালিক হচ্ছেন উত্তরসূরিরা। একযোগেরও বেশি সময় যাবদ বেদখল হওয়া রেলওয়ের সম্পদ বর্তমানে দখলদারদেও রাম রাজত্ব।
সেখানে গড়ে তুলেছে বসতবাড়ি, হাট বাজার। এসব দখল টিকিয়ে রাখতে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে ধর্মীয় সহানুভুতিরও। আর সে জন্য নির্মান করা হয়েছে মসজিদ মাজার। যাতে করে এসবের দোহই দিয়ে উচ্ছেদ ঠেকানো যায়। তদারকির জন্য গড়ে উঠেছে সাইনবোর্ডধারী সংগঠন।

এমনই চিত্র নারায়ণগঞ্জ আদমজী রেললাইনের। সব চেয়ে প্রাচীন এ রেল লাইনে রেল চলাচল বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তার পর থেকে চলছে রেলের জমি দখল পাল্টা দখল। এসব দেখেও কিছুই যেন করার নেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের।
২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এসে সরেজমিনে পর্যবেক্ষন করেন এবং সড়কটিতে বাইপাস সড়ক করার ঘোষনা দিয়ে দখল ছাড়ার জন্য ১ মাসের আল্টিমেটাম দিলেও পরর্বীতে আর কোন খোঁজ খবর নেয়নি তিনি।

তথ্য অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, ১৮৬২ সালে  মালামাল আনা নেয়ার জন্য তৈরি করেন তৎকালিন বিট্রিশ সরকার এবং এই রেললাইনটি চালু করেন। তখন নরসিংদী পর্যন্ত এর পরিসীমা ছিল। তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ বিশ্ব খাদ্য গুদাম (সাইল) পর্যন্ত প্রায় ১৫দশমিক ০৮ কিলোমিটারের উক্ত রেল সড়কটি ব্যবহারিত হতো মালামাল আনা নেয়ার জন্য।
পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের সময় ১৯৫১ সালে গড়ে উঠা আদমজি জুটমিলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাট পন্য আনা-নেয়া হতো এই সড়কটি দিয়েই। কিন্তু পাটকলটির পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব অবহেলার কারণে ৫১ বছর পরে ২০০২ সালের ৩০ জুন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে চাষাড়া-সিদ্ধিরগঞ্জের বিশ্ব খাদ্য গুদাম পর্যন্ত রেল সড়কটি পরিত্যক্ত অবস্থায় অরক্ষিত আছে।

বর্তমানে রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে বেদখল হয়ে গেছে রেলওয়ের শত কোটি টাকার সম্পতি। আদমজি পাট কল বন্ধের পাশা পাশি শহরের চাষাড়া থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের বিশ্ব খাদ্য গুদাম (সাইলো) পর্যন্ত রেল চলাচলও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চুরি হয়ে গেছে কয়েক কোটি টাকার অরক্ষিত রেল লাইনের স্লীপার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রেল সড়কটির দুই পাশে সরকারি জমির উপর অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি বাড়ি ঘর, অর্ধশতাধিক হাট বাজার, ৮টি সামাজিক সংগঠনের কার্যালয় এবং ১০ টি মসজিদ ও মাজার। গড়ে তোলা হয়েছে টিনশেডের বসতঘর, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অফিস।

রেলের জমিতে গড়ে উঠা সামাজিক সংগঠন হলো- খাঁনপুর রেললাইন মানব কল্যান সংস্থা, সূর্যতরুন ক্রীড়া সংসদ, আল্ ছাফরাতুল মাইয়েত দাফন কমিটি ও মানব কল্যান সংঘ, আশার আলো কল্যান সংসদ, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রসাদ নিমান শ্রমিক ইউনিয়ন, বাইট মানব কল্যান বহুমুখী সমবায়, ভূইয়া পাড়া যুব সংঘ ও শ্রুতি বিদ্যা পাঠ।
আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলো হলো হযরত শের শাহ (রা) এর মাজার, বাইতুল নুর জামে মসজিদ, আব্বসী মঞ্জিল জৌনপুরী দরবার শরীফ, মারকাজু তাহরিকে খাতমে নুবুওয়্যাত কারামতিয়া মাতলাউল উলুম মাদ্রাসা, পাঠানটুলী জামে মসজিদ, পাঠানটুলী ঈদগাহ্ ময়দান, বাইতুল মামুন জামে মসজিদ, গোদনাইল জলসাঘর জাকের মনজীল, বাইতুল নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিম খানা এবং আজিবপুর বাগবাড়ী মসজিদ।

হাজিগঞ্জ বাজারের একজন ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে জানান, আমি এখানে ব্যবসা করি ২০১০ সাল থেকে। তখন থেকেই দেখে আসছি এখানের সকল দোকান ভাড়া তোলে হযরত শের শাহ্ (রাঃ) এর মাজার কমিটির লোক জন।
একই বিষয়ে পাঠানটুলী এলাকার আজিজুর রহমান জানান, দিন দিন রেল লাইনের সড়কটি পাশে ছোটই হচ্ছে। বাজার বসছে সরকারি রেল লাইনের উপর আর টাকা নিচ্ছে স্থানীয় সরকার দলীয় প্রভাবশালী মহল।

রেলওয়ে সূত্রে জানিয়েছে, সড়কটির মাঝে র্কালভাট থাকা স্থান গুলোর উভয়ই পাশে ১২০ ফিট প্রশস্থ রেলওয়ের জমি। আবার কিছিু কিছু স্থানে ৬০ থেকে ৮০ ফিট জমি আছে। এছাড়া সড়কটি  দৈর্ঘ ১৫.০৮ কিলোমিটার।
এদিকে সম্প্রতিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) আইন, ২০১৪’ নিয়ে আলোচনা কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলওয়ের জমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, অবৈধ দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রেলওয়ের কি পরিমাণ জমি রয়েছে তার জন্য নতুন করে সার্ভে করতে হবে। এর পাশাপাশি কি পরিমাণ জমি দখলে রয়েছে তার জন্য একটি প্রতিবেদন দিতে হবে। এ জন্য রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।