নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের দেড় কোটি টাকার ঘাপলায় তোলাপাড় : তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়নি

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ

এলিট শ্রেণীর বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম নিয়ে চলছে তোলপাড়। আর্থিক অনিয়ম তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হলেও এখনও জমা দিতে পারেনি তদন্ত প্রতিবেদন।
ক্লাবে নিযুক্ত নিরীক্ষাকারী সংস্থা এস এইচ খান অ্যান্ড কোং গত ২৯ ডিসেম্বর ক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভায় উত্থাপিত করে নিরীক্ষা প্রতিবেদন। এতে গত বছর (২০১৬) ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকার অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসলে নড়েচড়ে বসেন ক্লাব সদস্যরা। ওই সময় সদস্যরা তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানালে ক্লাব সদস্য কাসেম জামালকে প্রধান করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, আব্দুর রাশেদ, আহসানুল করীম চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, আবদুল মজিদ খন্দকার, সামসুল হক, খাজা আজিজুল হক।
এদিকে এত দিন পেরিয়ে গেলও তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় ক্ষোভ বিরাজ করছে ক্লাব সদস্যদের মধ্যে। তবে তদন্ত কমিটি দাবী করছে, তারা তদন্তে সহযোগিতা চেয়ে নতুন কমিটির কাছে একটি চিঠি লিখলেও সেই চিঠির উত্তর দেয়নি কমিটি। যার কারণে তদন্ত কাজ এগিয়ে নিতে পারছেন না।
অপরদিকে অভিযোগ উঠেছে, গঠিত তদন্ত কমিটিও প্রভাবশালী পরিবারের ইশারায় নড়েন চড়েন। যার ফলে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হবে বলেও কেউ মনে করছেন না।

ওদিকে তদন্ত কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় কমিটির সদস্য আব্দুর রাশেদের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, এখনও তদন্ত শেষ করতে পারিনি। একই সাথে তিনি কাসেম জামালকে দেখিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে তিনি ভালো বলতে পারবেন।

তদন্ত শেষ করতে না পারার কী কারণ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্লাবের নতুন কমিটিকে আমরা একটি চিঠি দিয়েছি। সে চিঠির উত্তর এখনও তারা দেয়নি। যার কারণে তদন্ত কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।
এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নতুন কমিটির সভাপতি তানভীর আহমেদ টিঠুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমাদের কাছে দুই তিনদিন আগে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেটা ফোনে জানতে পেরেছি। এরমধ্যে আমার এক আত্মীয় অসুস্থ হয়ে পড়ায় ব্যস্ত হয়ে পরি। যার কারণে সেটি দেখতে পারিনি।

ক্লাবের সূত্র মতে, আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ার পর ক্লাবের ২০১৬ সালের কমিটির সভাপতি মাহমুদ হোসেন ও জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শংকর কুমার রায় ৫ জানুয়ারি একটি যৌথ প্রত্যয়নপত্র প্রদান করেছেন নিরীক্ষাকারী সংস্থাকে।
সখানে তারা লিখেছেন, ১নং নোট অনুযায়ি অসমন্বিত তহবিল বাবদ ৪২ লাখ ২৩ হাজার ২৯৬ টাকা বিভিন্ন কর্মকান্ডে অগ্রিম প্রদান করা হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করা হবে। ২ নং নোট অনুযায়ি দুটি নতুন সদস্য পদ ট্রান্সফার ফি ও অনুদানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। নোট ৫ থেকে ২০ পর্যন্ত ভাউচারের খরচাদি বাস্তবতার আলোকে প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন কারনে উক্ত খরচাদির অনুকূলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে উপরোক্ত অসংগতির কারনের দায় আমাদের ওপর বর্তাবে।

একটি সূত্র জানায়, গত ২০১৬ সালের হিসেবে গড়মিলের ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকার মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া শঙ্কর রায় ভারত যাওয়ার আগে একটি চেকের মাধ্যমে ৪০ লাখ ও নগদ ৬ হাজার টাকা ক্লাবে জমা দিয়েছেন। এরমধ্যে অভিযোগ উঠেছে বিতর্ক এড়াতেই দেশ ছেড়েছেন শঙ্কর রায়।

তবে, বাকি টাকা সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায় নি। এরমধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ক্লাবের ইজিএম। এখানে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ হতে পারে বলেই জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউরোপিয়ান ক্লাব পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড হয়। বর্তমানে এখানকার সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৪০০। প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্লাবের কমিটি গঠনের ঐতিহ্য থাকলেও ২০১০ সাল থেকে একটি বিশেষ পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবে নির্বাচন ছাড়াই ক্লাবের বেশির ভাগ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান পরপর দু’বার বিনা ভোটে সভাপতি হন। বর্তমান সভাপতি তানভীর আহমেদ টিঠু বিনা ভোটে সভাপতি হয়েছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের শ্যালক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি।

ক্লাব সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, নির্বাচন ছাড়া কমিটি গঠন করায় এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে যেমন, ৫৬ লাখ টাকা ক্লাবের ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে সহ-সভাপতি শংকর কুমার রায় তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা রেখেছেন। যা সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক।

এ প্রসঙ্গে তানভীর আহমেদ টিঠু বলেন, এটা তিনি কেন করেছেন কি জন্য করেছেন সে কারণ তার কাছ থেকে জানতে চাওয়া হবে। তবে তিনি এখন দেশে নেই। ফিরলে এসব নিয়ে আলোচনা করে হবে। এখানে যে হোক, ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে শংকর কুমার রায় দেশের বাইরে থাকায় তার সাথে কথা বলা যায়নি। তবে তিনি সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেছিলেন, ক্লাবের বিষয় বাইরে না আনাই ভালো।

এ ছাড়াও প্রভাবশালী বিশেষ ওই পরিবারের রাজনীতিকেরা ক্লাবে বসে তাদের সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেন। যদিও সদস্য ছাড়া বিনা অনুমতিতে ক্লাবে অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ, তারপরও তারা অবস্থানকালে তাদের লোকজন অবাধে যাতায়াত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হয় ক্লাবের সচিব শাহরিয়ারের সঙ্গে। তবে তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।

প্রশ্ন উঠেছে, ক্লাব থেকে গড়মিল হওয়া ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন ও সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি শংকর কুমার রায় একাই কী এ টাকা পকেটস্থ করেছেন, নাকি এর পিছনে প্রভাবাশালী কারো কোন ইন্ধন রয়েছে?
অনেকেই মনে করেন, মাহমুদ হোসেন ও শংকর কুমার রায়’র একার পক্ষে সম্ভব নয় ওই টাকা সরানোর। তাদের নেপথ্য কেউ না কেউ কাজ করছেন। তবে, যে বা যিনিই থাকুক তাদের সাথে তা খুঁজে বের করে এই টাকা অনিয়মের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা প্রহণের দাবী করেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্লাবের বেশ কিছু সদস্য।
এ প্রসঙ্গে বর্তমান ক্লাব সভাপতি তানভীর আহমে টিটু আরো বলেন, এখানে অনিয়ম করার কোন সুযোগ নেই। এটি একটি লিমেটেড ক্লাব। এটি সবার। তারা এ কাজটি কেন করেছেন? সেটা কী ক্লাবের স্বার্থে কিছু করেছেন কি না? তা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হবে।

এছাড়াও তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ক্লাবের ইন্টারনাল ব্যাপারগুলো কিভাবে আপনাদের পর্যন্ত পৌঁছায় (!) এটিও একটি চিন্তার বিষয়। তাছাড়া তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো রির্পোট করলে সে রিপোর্ট কতটা সত্য হতে পারে কিংবা তদন্তের পর প্রকাশিত সংবাদের সাথে গড়মিলি থাকলে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুই দেখাবে।
তবে তিনি জানিয়েছেন, ইজিএম ও ক্লাবের পিকনিকের ঝামেলা শেষ হলে সবাইকে নিয়ে বসে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তার আগে এ নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হবে। কেন না, আমাদের নতুন কমিটিকে আগের কমিটি থেকে সব কিছু’ই বুঝে নিতে হবে। তা না হলে আমাদের মেয়াদ শেষে এ দায়ভার গিয়ে আমাদের উপর পরবে। আমরা কেন আগের কমিটির অনিয়মের দায় নিতে যাব!।