বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক বিবর্তন: জোটের ইতি ও নতুন সমীকরণের সন্ধানে
- আপডেট সময় : ১২:৪৬:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 98
মীর আহাম্মদ মীরু
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে একে অপরের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে গঠিত চারদলীয় জোট থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিশ দলীয় জোট সবখানেই এই দুই দলের অবস্থান ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের এই দীর্ঘস্থায়ী সখ্যতা গড়ে উঠেছিল মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার অভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য থেকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিরচেনা দৃশ্যপটে আমূল পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের মিত্রতা ভেঙে এখন তারা একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে, যা দেশের রাজনীতির গতিপথকে সম্পূর্ণ নতুন একটি মোড় দিয়েছে।
এই বিচ্ছেদের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং আদর্শিক ভিন্নতাও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, যা একটি উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাসী। বিএনপি নিজেকে একটি মধ্যডানপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে ইসলামি মূল্যবোধের উপস্থিতি থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোটি মূলত আধুনিক গণতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা ‘ইকামতে দ্বীন’। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রভাবনা বিএনপির উদারনীতির চেয়ে অনেকটাই রক্ষণশীল এবং সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর নির্ভরশীল। এতদিন সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এই আদর্শিক পার্থক্যগুলো চাপা পড়ে থাকলেও, বর্তমান উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে তা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ভাবমূর্তির সংকটও এই রাজনৈতিক দূরত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। পশ্চিমা বিশ্ব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিএনপিকে জামায়াতের অতীত ইতিহাস ও ‘কট্টরপন্থী’ তকমা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে, দীর্ঘকাল বিএনপির ছায়ায় রাজনীতি করার ফলে জামায়াত নিজস্ব শক্তি ও স্বকীয়তা প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছিল না। বর্তমানে জামায়াত মনে করছে, তাদের এককভাবে শক্তি প্রদর্শনের সময় এসেছে এবং বিএনপির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তারা এখন একক নির্বাচনের পথে হাঁটছে।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের এই আলাদা হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এর ফলে সাধারণ ভোটারদের সামনে এখন আর কোনো অস্পষ্টতা বা বিভ্রান্তি নেই; তারা জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ধারা এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে যেকোনো একটিকে স্পষ্টভাবে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। রাজনীতিতে এই বিভাজন একটি দ্বিমুখী ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে উৎসাহিত করতে পারে। তবে একই ঘরানার বা দক্ষিণপন্থী ভোট ব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে দল দুটির জন্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের এই বিচ্ছেদ দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে যা ভবিষ্যতের ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই এবং সময়ের প্রয়োজনে মিত্রতা ও শত্রুতার সংজ্ঞা পাল্টাতে পারে। আগামী নির্বাচনই প্রমাণ করবে এই কৌশলগত ও আদর্শিক বিচ্ছেদ কার জন্য লাভজনক হলো এবং দেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দর্শনকে গ্রহণ করবে।



















