লংগদুতে শতাধিক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ: ১৪৪ ধারা জারি

যুবলীগ নেতা হত্যাকান্ডের জের ধরে পাহাড়ী-বাঙ্গালী উত্তেজনা

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের পাশে বৃহস্পতিবার পড়ে থাকা লাশ রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলা সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকালে তার নিজ বাড়ী লংগদু উপজেলার তিনটিলা,বাইট্টা পাড়া ও মানিকজোড় এলাকায় বেশকিছু বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে নিয়ে পাহাড়ী-বাঙালী একে অপরকে দায়ী করে। এ নিয়ে বাঙ্গালী বিক্ষোভকারীরা উপজাতীদের ঘরবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করেছে বলে অভিযোগ উপজাতীদের। তবে বাঙালীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পাহাড়ীরা নিজেরা নিজেদের ঘর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে বাঙালীদের উপর দোষ চাপাচ্ছে।

পাহাড়ী-বাঙ্গালী দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনায় লংগদু উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারী করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও সেনাবাহিনী সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। তারা স্থানীয়দের সাথে বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিযে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লংগদু সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের লাশ শুক্রবার সকাল ৮ টার দিকে তার গ্রামের বাড়ি বাইট্টা পাড়ায় নিয়ে গেলে হাজারো জনতার ঢল বিক্ষোভ মিছিলে রূপ নেয়। পরে বিক্ষোভ মিছিলটি যখন তিনটিলা জেএসএস কার্যালয় এলাকা অতিক্রম করছিলো তখন মিছিলের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, পাহাড়ীরা তিনটিলা এলাকার মারফত আলীর বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। মুহুর্তের মধ্যে উত্তেজিত জনতা উপজেলা জেএসএস কার্যালয় ভাঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়।

এক পর্যায়ে জনতা মিছিল সহকারে উপজেলা মাঠে সমবেত হলে সেখানে জানাজা পূর্ব শোক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শোকসভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান তোফাজ্জ¦ল হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন,জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মো: জানে আলম, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, সম অধিকার নেতা এডভোকেট আবছার আলী।

সমাবেশে রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য মো. জানে আলম বলেন, পার্বত্য এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা বারবার নিরীহ বাঙালীদের হত্যা করছে। এই চাঁদাবাজদের নির্মূল করতে হবে। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুজন পাহাড়ি নুরুল ইসলামের মোটরসাইকেল ভাড়া করেন। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়িরা নুরুল ইসলামকে হত্যা করেছেন। অবিলম্বে এই হত্যাকারীদের েেগ্রফতারের দাবী জানান।

সমঅধিকার আন্দোলনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এড. আবছার আলী বলেন, বারবার বাঙালী হত্যা মেনে নেয়া যায় না। হত্যাকারীরা চিহ্নিত। প্রশাসন ইচ্ছে করলেই তাদের গ্রেফতার করতে পারে। পরে প্রশাসনের তরফ থেকে নয়নের খুনিদের গ্রেফতারের আশ্বাস দেওয়া হয়। শোক সমাবেশ শেষে নয়নের জানাজা ‍অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে শোক সমাবেশ চলাকালে একদল দুবৃত্ত তিনটিলা, বাইট্টা পাড়া ও মানিকজোড় এলাকার বেশ কিছু পাহাড়ী বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিপুল পরিমাণ সমস্য ঘটনাস্থলে যায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তৎপরতার সাথে আগুন নিভিয়ে ফেলতে কার্যক্রম শুরু করে। এ ঘটনায় ১৫-২০ টি বাড়ি ও টং দোকান আগুনে পুড়ে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর দেড়শত সদস্য ও শতাধিক পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঘটনায় রাঙামাটি জেলা বাঙালী ছাত্র পরিষদের সভাপতি আলমগীর হোসেন, সাদেকুল হত্যাকান্ড ও নয়ন হত্যাকান্ডের ঘটনায় সর্বত্র যখন পাহাড়ীরা সন্ত্রাসীরা সমালোচিত হচ্ছিল এবং বাঙালীদের জনমত সংগঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখনি নয়ন হত্যাকান্ডের মোড় ঘুরিয়ে দিতে জেএসএস নিরীহ পাহাড়ীদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালীদের উপর দোষ চাপাচ্ছে। এদিকে তিনটিলা এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিশংকর চাকমা জানান, আমাদের পাড়ার একটি ঘরও অবশিষ্ট নেই। তিনটিলা এলাকার ২০০, বাইট্টা পাড়ার ৩০-৪০ টি, মানিকজোড় ছড়ার ৪০-৫০টির মতো ঘুর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানান, আমি বিষয়টি জানার সাথে সাথেই লংগদু উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করেছি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে এবং আইনশৃংখলাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কবস্থায় আছে।

রাঙামাটি পুলিশ সুপার সাইদ তারিকুল হাসান বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। ঘটনাস্থলে শতাধিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্ত না করে তিনি বলতে পারেননি। তবে ১২-১৫ ঘর ও টং পোড়ার কথা তিনি স্বীকার করেন। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা লংগদুর ইউএনও মো. তাজুল ইসলাম বলেন, লংগদুতে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সমস্যা হওয়ার কারণে সদরের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘নয়নের লাশ নিয়ে র‌্যালি করে আসার পথে কিছু লোক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। এসময় পুলিশসহ যৌথ বাহিনী ও প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লংগদু উপজেলায় পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকবে।

সর্বশেষ আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসাবে তিন বাঙালী যুবককে আটক করেছে। তারা হলো, মো. শরীফ, মো সবুজ, আবুল খায়ের। তিন জনের বাড়ি লংগদু সদর এলাকায়। এর আগে বৃহস্পতিবার লংগদু উপজেলা সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়ন (৩৫) দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। বৃহস্পতিবার দুপুরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চার মাইল এলাকা থেকে নয়নের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নয়ন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় মোটরসাইকেলে দুজন যাত্রী নিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে যান।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খাগড়াছড়ি সাবেক সংসদ সদস্য ও খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া। এ নিয়ে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবী শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন করেছে বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ।

আল-মামুন,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

মোবাইল: ০১৮৩৮৪৯৯৯৯৯

তারিখ: ০২-০৬-২০১৭