সাড়া ফেলছে আনন্দ স্কুল কার্যক্রম

আমানুল্লাহ আমান, কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতাঃ ‘আর নয় ঝরে পড়া আনন্দ স্কুলে লেখাপড়া’ এই সেস্নাগানকে সামনে রেখে সারা দেশে ১২২টি উপজেলায় ১০,৫৩৩টি চলমান আনন্দ স্কুল সাড়া জাগিয়েছে । ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীরা খঁজে পেয়েছে নতুন ঠিকানা। সরকারের প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আউট অফ স্কুল চিল্ড্রেন ফেইজ-২ (রস্ক) এর অধীনে ঝড়ে পড়া গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের পড়া লেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত আনন্দ স্কুলগুলো এখন শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ইঠেছে। কঁচিকাচার সমবেত কণ্ঠে শোর উঠেছে বর্ণমালার। এসব স্কুলগুলোতে ঐসব ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ দান করতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠিত আনন্দ স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা সরকারি সকল প্রকার সহযোগিতা পেয়ে তারা লেখা পড়ায় মনোনিবেশ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্য পুস্তক, উপবৃত্তি, স্কুল পোশাক, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রয়েছে বিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আনন্দ স্কুলগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিয়মনীতি অনুযায়ী স্কুল চালাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করছেন।

বাংলাদেশের আট থেকে চৌদ্দ বছরের যেসব শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি বা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারেনি অর্থাৎ নানা কারণে ঝরে পড়েছে, তাদের জন্য কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং রস্ক কর্তৃক অণুমোদিত শিখন কেন্দ্র। আনন্দ স্কুল অর্থাৎ রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রস্ক প্রকল্প ৯০টি উপজেলায় আনন্দ স্কুল স্থাপন করে প্রায় ৭,৫০,০০০ জন শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে রস্ক প্রকল্পের ২য় পর্যায়। নতুন ১০০টি উপজেলাসহ মোট ১৪৮টি উপজেলায় রস্ক দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়িত হয় । নতুন উপজেলাসমূহে ২০১৩ সালে এবং ২০১৪ সালে মোট ১৩,০০০ আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয় । পুরাতন ৪৮টি উপজেলায় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত প্রায় ২,৬০,০০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পর্যন্ত ২য় পর্যায়ের সকল সুযোগসুবিধা পায়। উল্লেখ্য, নতুন উপজেলায় প্রতিটিতে ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ ৫০টি এবং ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৮০টি আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বতমানে ১২২টি উপজেলায় ১০,৫৩৩টি আনন্দ স্কুল চলমান রয়েছে। আবার প্রতি বছর কিছু সংখ্যক আনন্দ স্কুল অনিয়মের কারণে বন্ধও হচ্ছে। এ প্রকল্প থেকে আনন্দ স্কুলকে অণুদান এবং শিক্ষার্থীকে ভাতা প্রদান করা হয়। প্রকল্পে স্থানীয় জনসমাজকে ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সরকারি ও বেসরকারি  সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কিটি বা সিএমসির মাধ্যমে আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় |

আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী হবে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু যারা কখনও বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি অথবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেনি, অর্থাৎ ঝরেপড়া শিক্ষার্থীরা হবে আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী। একটি আনন্দস্কুলে ২৫-এর চেয়ে কম এবং ৩৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকবে না।
শিক্ষক
উপজেলা শিক্ষা কমিটি কর্তৃক তালিকাভুক্ত এবং সিএমসি কর্তৃক চুক্তিবদ্ধ একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিখন-শেখানোর জন্য আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। মেয়েদের জন্য এসএসসি পাশ এবং ছেলেদের জন্য এইচএসসি পাশ, ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী যে কেউ আনন্দস্কুলের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

উপানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়াই আনন্দস্কুলের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের সময়সূচী হবে নমনীয়। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে এ সময়সূচী নির্ধারণ করা হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই অণুসারে আনন্দ স্কুলের পাঠদান প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। একই পাঠ্যক্রম অণুসরণ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে একই প্রশ্নে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আনন্দ স্কুলের একজন শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণীর পাবলিক পরীক্ষা সমাপনী পরীক্ষা সম্পন্ন করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে যে সময়টুকু বিদ্যালয়ে থাকতে হয়, তার চেয়ে কম সময় আনন্দ স্কুলে শিক্ষার্থীকে কাটাতে হবে। এই সময়কাল হবে তিন-চার ঘণ্টা।
শিক্ষার্থীদের পোশাক ও অন্যান্য সহায়তা
১৪৮টি উপজেলার সকল আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থীদের একই ডিজাইন এবং রংয়ের স্কুল ড্রেস দেওয়া হয়। স্কুল ড্রেস রস্ক কর্তৃক প্রেরিত অর্থ এবং ডিজাইন অণুসারে আনন্দ স্কুলের শিক্ষকের তত্ত্ববধানে তৈরি করা হয়। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট হারে উপবৃত্তি, খাতা-কলম ইত্যাদি প্রদান করা হয়। তাই যে সকল শিক্ষার্থী আর্থিক কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে, তারাও শিক্ষার আলোতে আলোকিত হতে পারবে।

প্রতিটি আনন্দ স্কুল পরিচালিত হয় একটি কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি বা সিএমসির মাধ্যমে। সিএমসি গঠন করা হয় আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মা/বাবা অথবা অভিভাবক চারজন (নারী-৩, পুরুষ-১), আনন্দ স্কুলের শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদের দুজন সদস্য (ওয়ার্ড সদস্য এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য), প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন শিক্ষানুরাগী সদস্য এই মোট ৯ জন সদস্য নিয়ে। সিএমসি কমিটি উপজেলা শিক্ষা কমিটি, উপজেলা শিক্ষা অফিস, সোনালী ব্যাংক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আনন্দস্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। মুলত সিএমসি কমিটির কাজ আনন্দ স্কুলের সকল পূর্বশর্ত যথাযথভাবে সম্পাদন করা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি তদারক করা, আলোচ্যসূচী অণুযায়ী নিয়মিত সভা করা, আনন্দ স্কুলের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন তৈরি করা এবং আনন্দ স্কুলের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া। এছাড়াও আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করাও সিএমসি কমিটির একটি প্রধান দায়িত্ব। মূলত একটি আনন্দ স্কুল পরিচালিত হবে সিএমসি কমিটির মাধ্যমে। সরকার এবং অন্যান্য সংস্থা যথা, পিও, সোনালী ব্যাংক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যথা- উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর, মনিটরিং অফিসার, সিএম আনন্দ স্কুলের সিএমসিকে সহায়তা করবেন মাত্র।
সিনিয়র মোবাইল ভ্যালিডেশন অফিসার (এসএমভিও) ও মোবাইল ভ্যালিডেশন অফিসার (এমভিও)

আনন্দ স্কুল সম্পর্কে সকল প্রকার ভেলিডেশনের কাজ করার জন্য রস্ক কর্তৃক তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা এবং এমআইএস সেলের তত্ত্বাবধানে সিনিয়র মোবাইল ভ্যালিডেশন অফিসার (এসএমভিও) ও মোবাইল ভ্যালিডেশন অফিসার (এমভিও) কাজ করছেন। যা আগে মনিটরিং অফিসার বা এমও হিসেবে কাজ করেছেন।

রস্ক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত টেনি কো-অর্ডিনেটর যারা উপজেলা পর্যায়ে কাজ করছেন। আনন্দ স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মান উন্নয়ন, পাঠ পরিচালনায় সহায়তা, শ্রেণী শিক্ষা পর্যবেক্ষণ, অব্যাহত পরিবীক্ষণ এবং উপজেলায় রস্ক কার্যক্রম সমন্বয় করেন। এছাড়া্ও নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত মোবাইল পুল টিচার ৮-১০টি কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিএমসি কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য যিনি তাঁর ক্যাচমেন্ট এলাকার আনন্দ স্কুলগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করেন। প্রতিমাসে একবার করে আনন্দস্কুলের শিক্ষকদের সাথে মিটিং করে মাসিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক দেখাশোনা করা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করাই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে আনন্দ স্কুলের পার্থক্য হবে সময়সূচিতে। সারা বাংলাদেশে প্রায় একই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হয়। কিন্তু আনন্দ স্কুল পরিচালিত হবে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে। এছাড়া একই বই এবং একই কারিকুলাম ও প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করা হবে। একটি আনন্দস্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক থাকবেন যেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চার-পাঁচজন শিক্ষক থাকেন। তবে নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত মোবাইল পুল টিচারবৃন্দও সহায়ত টিচার হিসেবে কাজ করছেন।

উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস সকল কাজের তদারকি করবে এবং সিএমসি কমিটি, টিসি, এমভিও, পিওদের সহায়তা করবে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার প্রাথমিকভাবে স্কুলবহির্ভূত শিক্ষার্থীদের আধিক্য বিবেচনা করে আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠার মুখ্য ব্যক্তি হিসেবে কাজ করবেন, ভাতা ও অণুদান বিতরণ পরিবীক্ষণ করবেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পরিবীক্ষণ করবেন। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং রস্ক কর্তৃক আনন্দস্কুল সম্পর্কিত অন্যান্য কাজও করবেন।

রূপরেখা এবং বিধিপ্রণয়নপূর্বক প্রকল্প পরিচালনার যাবতীয় ম্যানুয়াল তৈরি করবে, প্রকল্প কার্যক্রম পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার কাজ করবে, বাজেট প্রণয়ন এবং প্রতিবেদন তৈরি করবে, আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠা ম্যানুয়ালে নির্দেশিত নিয়মে অণুসারে আনন্দ স্কুল অণুমোদন করবে।