সিত্রাং- এ যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে

বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে ওঠা এবং জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকায় সিত্রাংয়ের কারণে যতটা ক্ষয়ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই ঝড়ে সেরকম কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি। কারণ ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল ছিল। শুধু বৃষ্টি আর বাতাস বেশি হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে তিনি জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এবং ভোলার কিছু বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে, জোয়ারের পানি ঢুকেছে আর কিছু মাছের ঘেরে পানি ঢুকেছে।

‘তবে জলোচ্ছ্বাসের যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ভাটার সময় ঘূর্ণিঝড়টা অতিক্রম করতে শুরু করায় সেই জলোচ্ছ্বাস হয়নি। ফলে উপকূলীয় এলাকায় তেমন বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি’, তিনি বলছেন।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রচুর বৃষ্টি ঝড়িয়ে আসার কারণে স্থলভাগে উঠে আসার সময় ঝড়টি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে ঝড়ের কারণে নয়জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে এদের বেশিরভাগের গাছ চাপা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নড়াইল, ভোলা, বরগুনায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ ভোররাত থেকেই বাড়ি ফিরে যেতে শুরু করেছে।

এখন বেশিরভাগ সবগুলো আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ তাদের ঘরে ফিরে গেছেন।

বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক
ঘূর্ণিঝড় শুরুর আগে আগে যেসব বড় জাহাজ বর্হিনোঙ্গরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেগুলো আবার বন্দরে ফিরতে শুরু করেছে।

চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সেখানকার বন্দরে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

গাছ পড়ে রাতে ঢাকার অনেক সড়ক, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার সকাল নাগাদ সড়কে আবার স্বাভাবিক যানচলাচল শুরু হয়।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে সোমবার থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলাগুলোয় নৌ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সেটি আবার চালু হয়েছে।

সোমবার দুপুর থেকে ২১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বরিশাল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিমানবন্দর আবার চালু হয়েছে।

সোমবার ঝড়ের কারণে সাতটি আন্তর্জাতিক আর একটি অভ্যন্তরীণ বিমান যাত্রী নিয়ে ঢাকার পরিবর্তে সিলেটে অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেগুলোও ঢাকায় ফিরে এসেছে।

সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের পরিচালক মোঃ হাফিজ আহমেদ জানিয়েছেন, মোট আটটি বিমান ঢাকার পরিবর্তে সিলেটে অবতরণ করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে সাতটি আন্তর্জাতিক আর একটি অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থা রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এখন লঘুচাপ
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং শক্তি হারিয়ে এখন একটি লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। বিকালের মধ্যে সেটি আরো দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে ভারতে চলে যাবে বলে আবহাওয়াবিদরা বলছেন।

আব্দুল মান্নান বলেছেন, ‘এর মধ্যেই এটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই এটি বিলীন হয়ে যাবে।’

‘আমরা আশা করছি, আগামী ছয় ঘণ্টার মধ্যে এই আবহাওয়া থেকে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেবে। ফলে সারা বাংলাদেশ থেকে এর প্রভাব চলে যাবে। আজ বিকেল থেকেই সারা বাংলাদেশে আমরা স্বাভাবিক আবহাওয়া ফিরে পাব।’

দুপুর একটা নাগাদ ভারতের আবহাওয়া দফতরের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, লঘুচাপটি সকাল ৯টা নাগাদ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব এলাকায় অবস্থান করছিল। পরবর্তী ছয় ঘণ্টার মধ্যে সেটি আরো দুর্বল হয়ে যাবে।

বরিশাল থেকে পটুয়াখালী যাওয়ার পথে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা কাদির কল্লোল দেখতে পেয়েছেন, সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। রাস্তার পাশে উপড়ে পড়া গাছ পড়ে থাকা ছাড়া ঝড়ের প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সেখানকার আবহাওয়া একেবারে রৌদ্দ্রজ্জল হয়ে উঠেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কলাপাড়া, খেপুপাড়ায় আমন ধানের এবং সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড় ও বৃষ্টির কারণে সেখানে পানি জমে রয়েছে।

‘৮০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে’
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে এখন দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় ৮০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘ঝড়ের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় সবচেয়ে আঘাত পড়েছে। তার ছিঁড়ে, গাছ উপড়ে, পোল ভেঙ্গে পড়ে অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে সেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক না করা পর্যন্ত বিদ্যুৎ চালু করা হবে না।’

তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা এসব লাইন মেরামতের কাজ করছেন। বুধবার দুপুরের মধ্যে তারা শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবেন বলে আশাবাদী।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮০ লাখ মানুষ এখন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।

শুধুমাত্র পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডেরই আটশোর বেশি বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশেষ করে সাব স্টেশনের পানি ঢোকায় অনেক স্থানে ক্ষতি হয়েছে।

সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে দক্ষিণের জেলাগুলোর অনেক এলাকা সোমবার সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে।

বরগুনার আমতলীর বাসিন্দা লায়লা রেহানা জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল থেকেই সেখানে বিদ্যুৎ চলে গেছে। এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বিপর্যস্ত রাজধানীবাসীরাও
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সরাসরি প্রভাব না পড়লেও প্রবল বৃষ্টি আর বাতাসের কারণে সোমবার রাজধানী বাসিন্দাদের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঢাকার নিউমার্কেট, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমণ্ডি, গ্রীনরোড, বাসাবোসহ অনেক এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার তৈরি হয়।

অনেক সড়কে যানবাহনে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

গতকাল দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে বরিশালে, ৩২৪ মিলিমিটার। এরপরেই ঢাকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৫৫ মিলিমিটার।

মঙ্গলবার দুপুরেও মোহাম্মদপুর, আজিমপুরের বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকায় পানি জমে রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকার অনেক এলাকায় গাছ পড়ে যানবাহনের ক্ষতি এবং সড়কে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব গাছপালা কেটে সরানোর কাজ শুরু করে সিটি কর্পোরেশন কর্মীরা।

মহাসড়কে গাছ পড়ার কারণে সোমবার রাতে ঢাকার সাথে খুলনা ও বরিশালের সড়ক যোগাযোগ কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেসব গাছ সরানোর পর আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

কিভাবে ঝড় তৈরি হয়?
সমুদ্রের উষ্ণ পানির কারণে বায়ু উত্তপ্ত হঠাৎ করে এসব ঝড়ের তৈরি হয়।

তখন তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে যাওয়ার কারণে ওপরে উঠে যায়। আর ওপরের বাসা ঠাণ্ডা বাতাস নিচে নেমে আসে। এসে নিচের বায়ুমণ্ডলের বায়ুর চাপ কমে যায়। তখন আশেপাশের এলাকার বাতাসে তারতম্য তৈরি হয়।

সেখানকার বাতাসের চাপ সমান করতে আশেপাশের এলাকা থেকে প্রবল বেগে বাতাস ছুটে আসে। আর এ কারণেই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়ের।

এর ফলে প্রবল বাতাস ও স্রোতের তৈরি হয়। যখন এসব এই বাতাসের ভেসে ঝড়টি ভূমিতে চলে আসে, তখন বন্যা, ভূমিধ্বস বা জলোচ্ছ্বাসের তৈরি করে।

সাইক্লোন, হারিকেন আর টাইফুনের মধ্যে পার্থক্য কী?
এই সবগুলো ঝড়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন আটলান্টিক, ক্যারিবিয়ান সাগর, মধ্য ও উত্তরপূর্ব মহাসাগরে এসব ঝড়ের নাম হারিকেন।

উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সেই ঝড়ের নাম টাইফুন।

বঙ্গোপসাগর, আরব সাগরে এসব ঝড়কে ডাকা হয় সাইক্লোন নামে।

যদি কোনো নিম্নচাপ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি আঞ্চলিক ঝড় বলে মনে করা হয় এবং তখন সেটির নাম দেয়া হয়। কিন্তু সেটি যদি ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার (৭৪ মাইল) গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি হারিকেন, টাইফুন বা সাইক্লোন বলে ডাকা হয়।

এগুলোর পাঁচটি মাত্রা হয়েছে। ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করলে সেটির সর্বোচ্চ পাঁচ মাত্রার ঝড় বলে মনে করা হয়। তবে অস্ট্রেলিয়া ঝড়ের মাত্রা নির্ধারণে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে।

সূত্র : বিবিসি

বিডিসংবাদ/এএইচএস