সেন্সরবোর্ডে ‘কাঠগোলাপ’, ভাইস চেয়ারম্যানের ইচ্ছা-অনিচ্ছা

সেন্সরবোর্ডে ‘কাঠগোলাপ’, ভাইস চেয়ারম্যানের ইচ্ছা-অনিচ্ছা : আহমেদ তেপান্তর

আহমেদ তেপান্তর

‘এটা প্রেমের ছবি, কিন্তু অন্যরকম প্রেমের ছবি। এতে অনেকগুলো মানুষের জীবনের গল্প বলা হয়েছে। কাঠগোলাপ যেমন প্রচুর সুবাস দেয়, আমাদের এ মানুষগুলোও সবার অনেক কাজে লাগে। এসবের পড়েও মানব মননে একধরনের স্থবিরতা কাজ করে। আর এ থেকেই তৈরি হয় সংকট। সম্পর্কের এমন অনেক স্তর সমাজের চারপাশ জুড়ে দেখা যায়। অব্যক্ত এই সমস্যা কখনো গভীর সংকটের সৃষ্টি করে’- অপূর্ণ রুবেলের এমন গল্প নিয়ে সাজ্জাদ খান নির্মাণ করেছেন ‘কাঠগোলাপ’। সিনেমাটি সেন্সরবোর্ডে জমা পড়েছে গত ২১ সেপ্টেম্বর। ২৪ সেপ্টেম্বর সিনেমাটি বোর্ডের সামনে প্রদর্শিত হয়। সেন্সর বোর্ডের সিনেমা সংশ্লিষ্ট সদস্যরা নতুন এই গল্পটিকে সাধুবাদ জানালেও ভাইস চেয়ারম্যানের খেয়ালের শিকার সিনেমাটি গত পৌনে দুই মাসেও সেন্সরবোর্ডের চৌকাঠ পেরুতে পারেনি।

দেশে যখন বিনাদোষে সেন্সরের অন্ধকার কুঠরে ঢুকরে মরছে সিনেমাটি ঠিক তার বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হচ্ছে নারীবাদী গল্পের কাঠগোলাপ। এরমধ্যে সিত্তানভাসাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা এশিয়ান ফিচার ফিল্মের পুরস্কার, নিতিন চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ডেব্যু ফিল্ম, মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত নেভী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা নারী চলচ্চিত্রের মর্যাদা, আথভাকরুনি পুরস্কার, থিলস্রি আর্ন্তজাতিক উৎসবে সেরা নারী ফিচার ফিল্মের মর্যাদা, রোহিপ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্য ছাড়াও কাঠগোলাপ বা ঞযব ঝপবহঃষবংং সিনেমাটি জাফনা গ্লোবাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা প্রযোজকের মর্যাদা দেশের সিনেমার এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তার পতাকা বহন করছে।

জানা গেছে, দেশের প্রেক্ষপটে ভিন্নধর্মী গল্প হওয়ায় ভাইস চেয়ারম্যান অধিকতর সাবধানতা অবলম্বন করছেন। যে কারণে অফিসিয়ালি প্রযোজক ফরমান আলীকে কিছু জানানো হয়নি।

এ ব্যাপারে সিনেমাটির প্রযোজক ফরমান আলীর বক্তব্য, অফিসিয়ালি আমাকে কিছু জানানো হয়নি। আমাকে সেন্সরবোর্ডের সিনেমা সংশ্লিষ্ট সকল সদস্যরাই পজেটিভ উত্তর জানিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে আমি আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু দেরি করায় সময়ক্ষেপনের কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে জানতে পারি সকলে পজেটিভ থাকলেও সেন্সরবোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান বিষয়টি আরো বুঝতে চাইছেন। সে কারণে বিভিন্ন দেশি-বিদেশী জার্নালের প্রতিবেদন, বহু আন্তর্জাতিক সিনেমার নাম ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের একজন স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপকের বক্তব্যের ফুটেজও জমা দিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, উনি বুঝতে চাইছেন না অথবা বুঝতে পারছেন না।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে তিনি না বুঝে থাকলে ঊর্ধ্বতন হিসেবে সেন্সরবোর্ডের চেয়ারম্যান সাহেবের সাহায্য নিতে পারেন কিন্তু সেটাও করছেন না। আমি বলবো এভাবে সিনেমাটির মেরিট নষ্ট হচ্ছে, এতে অর্থনৈতিক ক্ষতিরমুখে পড়ছি আমি। ভাইস চেয়ারম্যান সাহেবের বুঝতে হবে সিনেমাটি বিদেশের মাটিতে দেশের হয়ে গৌরব অর্জন করেছে। এখনও আমাকে অফিসিয়ালি হ্যাঁ বা না কিছুই জানানো হয়নি।

এ নিয়ে সেন্সরবোর্ডের সদস্য অরুণা বিশ^াস তার বক্তব্যে বলেন, এটা একেবারেই নতুন গল্প, আমাদের কাছে ভালো লেগেছে। এমন গল্পগুলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। সাহস নিয়ে প্রযোজক বড় ধরনের একটা ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি প্রশংসার দাবিদার। আমি ছাড়াও ফাল্গুনী হামিদও এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আমরা সিনোমটির সেন্সর দিতে ইতিবাচক সুপারিশ করেছি, বাকিটা ভাইস চেয়ারম্যানের এখতিয়ার।

সিনেমা গবেষক অনুপম হায়াত তার বক্তব্যে বলেন, এটা আমার বলার দায়িত্ব না, এটা বলবে সেন্সরবোর্ডের অথরিটি যিনি সে। আমি বলতে পারি না। কিছু অবজারবেশন দিয়েছি বাকিটা অথরিটির বিষয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডর এক প্রভাবশালী সদস্যের বক্তব্য- আমিসহ কয়েকজন অনেক আগেই ইতিবাচক সুপারিশ করে অনাপত্তিজ্ঞাপন করেছি। এখন যে সাবজেক্ট এটা একেবারেই নতুন, বিষয়টি ভাইস চেয়ারম্যান নিজে বুঝতে পারছেন না, বোঝার চেষ্টা করছেন বলেও মনে হয় না। তবে এটা অনুচিত এরফলে প্রযোজক ক্ষতির মুখে পড়বে, যার দায় আমরা এড়াতে পারি না।

এ নিয়ে সেন্সরবোর্ডের সচিব মাইনউদ্দিনের বক্তব্য- আমরা সেন্সরবোর্ডের সদস্যদের সুপারিশ পেয়েছি সে আলোকে কাজ এগিয়ে চলছে। কবে নাগাদ প্রযোজক এই অগ্রগতি অফিসিয়ালি জানতে পারবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিগগিরই জানতে পারবেন। ডিসেম্বরে সেন্সরবোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানের অবসরে যাওয়ার পর না আগে এমন প্রশ্নের সচিবের কূটনৈতিক জবাব আমরা প্রসেসিং করছি শিগগিরই প্রযোজককে এ ব্যাপারে অফিসিয়ালি জানিয়ে দেওয়া হবে।

সেন্সরবোর্ড নিয়ম অনুযায়ী ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে বিষয় পরিস্কার না হলে তিনি চেয়ারম্যানের কাছে দিক নির্দেশনা চেয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। কিন্তু কাঠগোলাপ সিনেমার ব্যাপারে এখনও এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে জানা গেছে। আর এতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল প্রশংসিত ও পদকজয়ী কাঠগোলাপের ভাগ্য সেন্সরবোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানের ইচ্ছার ওপর ঝুলে আছে।

‘কাটগোলাপ’ প্রযোজকের অনুযোগের ভিত্তিতে বক্তব্য নিতে সেন্সরবোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাইফুল্লাহর মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

ড্রিমল্যান্ড এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন মো. ফরমান আলী।

বিডিসংবাদ/আতে/এএইচএস