ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করে কঠোর অবস্থানে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৮:০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 19
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং নিজ দেশের রক্ষণশীল মহলের প্রবল চাপের মুখেও তিনি তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এমন দৃঢ়চেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুব কমই দেখা গেছে।
ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার ইসরাইলের অবৈধ বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক রায়ের সঙ্গে সংগতি রেখেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইসিজের ওই রায়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে সব রাষ্ট্রকে এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
মিলিব্যান্ডের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন। অথচ মিলিব্যান্ড নিজেও একজন ইহুদি। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্রিটেনকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এছাড়া ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ব্রিটেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে তার পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যখন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ব্রিটেনের বিরোধিতা করে আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন নাও করতে পারে।
ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই পরিকল্পনা নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট। রক্ষণশীল বিরোধী দল এবং ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো মিলিব্যান্ডের কঠোর সমালোচনায় মুখর। ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম টুগেনহাট দাবি করেছেন, বসতি নিষেধাজ্ঞার ফলে ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইল’ এই পরিকল্পনাকে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং ইসরাইলকে এককভাবে নিশানা করার কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছে।
এত চাপের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল মিলিব্যান্ড গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টে তার প্রথম বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। গাজা পরিস্থিতিকে তিনি ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করে ব্রিটিশ সরকারকে আরও দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মূল কারিগর মিলিব্যান্ড নিজেই। তার পূর্বসূরি লেবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও ইয়েভেট কুপারের চেয়ে তিনি এ বিষয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ডের এই যুগলবন্দি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর করতে হলে কেবল পণ্য নয়, বরং বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও বেলজিয়াম ইতিমধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নিলেও ব্রিটেনের পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের নতুন ‘ই১’ বসতি প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যা কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে তুলবে।
ইসরাইলপন্থী সমালোচকদের অভিযোগ, ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চাপের মুখে মিলিব্যান্ড এমন অবস্থান নিয়েছেন। তবে জনমত জরিপ ভিন্ন কথা বলছে। একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন। এছাড়া লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি এমপি এবং দলের ৮৭ শতাংশ সদস্য এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে মিলিব্যান্ডের অবস্থান কেবল দলীয় নয়, বরং ব্রিটিশ জনমতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মিলিব্যান্ডের এই অবস্থান নতুন নয়। ২০১৪ সালে লেবার নেতা থাকাকালে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ‘নীরবতা’র কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনাকে ভুল বলে মন্তব্য করেছিলেন। গত বছরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগকারী মন্ত্রীদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মিলিব্যান্ডের এই পদক্ষেপ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। স্টারমার সরকারের আমলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলোকে অনেকে ‘অর্ধেক-সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখেছেন। অস্ত্র রপ্তানিতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। এখন মিলিব্যান্ডের প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়িত হলে তা কেবল ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতিতে পরিবর্তন আনবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠতারও বড় ধরনের পরীক্ষা নেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে এমন দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি বছরের শুরুতে লেবার সদস্যদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে ৮৭ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মিলিব্যান্ডের বর্তমান অবস্থান হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বদলে যাচ্ছে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির চেহারা।



















