নির্ধারিত দামেও মিলছে না এলপিজি, বাজারে চরম অস্থিরতা
- আপডেট সময় : ১০:২৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
সরকারিভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম পুনর্নির্ধারণ করা হলেও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা চরম সংকটের মুখে নির্ধারিত মূল্যে রান্নার গ্যাস মিলছে না বলে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে গ্রাহকদের প্রতি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
রাজধানীর হাতিরপুলের এক ভুক্তভোগী জানান, গত ২ অক্টোবর ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তার খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা, যেখানে ওই সময় সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ ঘাটতির কারণে তাদের কেনা খরচ বেড়েছে, তাই নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিরপুরের এক দোকানদার জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, নতুন সরবরাহ পেলেও সেটির দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা পড়বে। মুন্সীগঞ্জের ডিলার জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ২০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ডিলার পর্যায়েই কোনো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও একই পরিস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারে তাঁর খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা, যা তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, অপারেটররা ১ হাজার ৭৪২ টাকায় সিলিন্ডার ডিলারদের সরবরাহ করবে এবং ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা যোগ করে গ্রাহক পর্যায়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা দাম নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর সরবরাহ বন্ধ থাকার পর নতুন করে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৯০ টাকা দামে দাবি করছে অপারেটররা, যা নির্ধারিত পাইকারি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। সেপ্টেম্বর মাসে তার ২০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২ হাজার সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে। গ্যাসবাহী গাড়ি মোংলায় আটকা পড়ার অজুহাতেও পরিবহন ব্যয় বাড়ার দোহাই দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে সরবরাহ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে ডিলারও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। সেপ্টেম্বরে ২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পেয়েছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতি অভিযোগ করেছে যে, নতুন মূল্য ঘোষণার পরও অপারেটররা ডিলারদের কাছে ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চেয়ে সিলিন্ডার সরবরাহের প্রস্তাব দিচ্ছে। সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খানের মতে, অপারেটরদের এই বাড়তি দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এ বিষয়ে সমিতি বিইআরসিকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশে এলপিজির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও মাত্র ১০ থেকে ১২টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন আমদানি হলেও সেপ্টেম্বরে তা সামান্য কমে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টনে নেমেছে। আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও কেন এই তীব্র সংকট, তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গ্রিন এলপিজির জেনারেল ম্যানেজার আহসান হাবিব হিরো জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ না পাওয়ায় তার প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে, অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক আমদানির কোটা, লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সীমাবদ্ধতাকে সংকটের কারণ হিসেবে দাবি করেছেন। বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি হয়।
সংকট নিরসনে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে যেন নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে অভিযান চালালেও গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল মিলছে না। বিইআরসি জানিয়েছে, সংকট খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে যারা আমদানি ও সরবরাহ তথ্য বিশ্লেষণ করবে। কয়েকটি কোম্পানি মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করলেও, খুচরা ও ডিলার পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার এই চক্র ভাঙতে কোনো কার্যকর সমাধান এখনো অধরা রয়ে গেছে। আবার যেসব কোম্পানি নিজেরা আমদানি না করে অন্য অপারেটরের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে।

























