মিশনের চিঠিতে আর যা আছে: সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
- আপডেট সময় : ১০:০২:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / 6
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে একজন সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইন লঙ্ঘনের এবং অন্যজন ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। তারা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সৌদি কারাগারে বন্দি ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানায়। তবে এই চূড়ান্ত পদক্ষেপের আগে বাংলাদেশ মিশনকে কোনো কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি মিশনের নজরে না আসার ঘটনাকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত বিস্ময়কর হিসেবে দেখছেন। দুজনেই সৌদি আরবের আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। একজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, অপরজনের টাঙ্গাইলে। ১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা এখনও কোনো খবর, সংবাদ পাইনি। সবশেষ ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার তথ্য চায় সরকার। তাদের মৃত্যুদণ্ডকে দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে অভিহিত করে সৌদি আরবের স্থানীয় আইনের কঠোরতার কথাও সাংবাদিকদের প্রশ্নে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। মৃত্যুদণ্ডের ধারায় চলা বিচার এবং রায় কার্যকরের বিষয়ে সৌদি সরকার থেকে বাংলাদেশ মিশনকে ‘না জানানো’ হয়ে থাকলে সেটিকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পাঠানো জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের গত ১৮ অক্টোবরের চিঠিতে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। চিঠিতে বলা হয়, ওই বাংলাদেশি পুরুষ ২০২৩ সালের ১ আগস্ট গ্রেপ্তার হন। অন্যদিকে, একই বছরের ২ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি নারীকে জেদ্দা মহিলা কারাগারে রাখা হয়েছিল। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগে এর আগে কোনো বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এমন নজির নেই বলে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এছাড়া সাইবার অপরাধের অভিযোগে মক্কায় আরও তিনটি পৃথক মামলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই তালিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজনের নাম-পরিচয় থাকলেও শাস্তির কোনো তথ্য ছিল না। এর মেয়াদ সর্বনিম্ন ১ মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর।
শ্রম কল্যাণ উইংয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক কাজে লিপ্ত’ হওয়ার কথা বলা হলেও, তাদের গ্রেফতারের কারণ ভিন্ন ছিল। সৌদি সরকারের কাছে করা অনুরোধের প্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বন্দি বাংলাদেশিদের একটি তালিকা মিশনকে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক অভিযোগে ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। কিন্তু তাদের কারো ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পূর্ব নজির ছিল না। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ মিশনকে অন্ধকারে রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, “এত সিরিয়াস একটি বিষয়, এটি তো একদিনে হয়নি, দীর্ঘ সময় ধরে হয়েছে। ওভার দ্য পিরিয়ড হলে এটি অবশ্যই মিশনের নলেজে থাকা উচিত ছিল। নলেজের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমার সময়ে যা দেখেছি, সেটাই তখন চলছিল।” শ্রম কল্যাণ উইংয়ের চিঠিতে বলা হয়, তালিকার সাত নম্বর কলামে রায় ঘোষিত বন্দিদের সাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকার কথা। সৌদি প্রেস এজেন্সির ওই খবরে বাংলাদেশি এক নারী ও পুরষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা লেখা হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতায় সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারে বিভিন্ন চারিত্রিক মামলায় আটক ৩০৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১৪৭ জনের সাজা ঘোষিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক তাসনীম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “এটি জানার দায়িত্ব মিশনেরই অংশ। এসব বিষয়ে আরও বেশি খবর রাখা ও সচেতন থাকা দরকার।” এদিকে, ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট গত ১৫ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পুনরায় চিঠি দেয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রদূতকে জরুরি বৈঠকে ডেকে এর আগে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কপি হস্তান্তর করা হয়েছে। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠানো হবে বলে মিশন জানিয়েছে। আমরা সংবাদটা পাওয়ার জন্য এবং আসলেই কী ঘটেছে, তাদের বিস্তারিত কী, তারা কবে কাজ করতে গিয়েছে, তাদের বাংলাদেশের পরিচয়টা কী, এইসব বিস্তারিত জানার জন্য আমরা চিঠি দিয়েছি। “পরিচয় বলতে আমরা নামটা জানি। তার কথায়, “জানাটা আমার দায়িত্ব, আমার কাজের অংশ, তাই না। সুতরাং, এইটা আমি এভাবেই বলব যে, এসব বিষয় আরও অনেক বেশি খবর নেওয়ার দরকার, আরও অনেক বেশি সচেতন থাকা দরকার।”।
সৌদি আরবের আদালতে শুনানির সময় অনুবাদক নিয়োগের বিষয়টি ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহিদ’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে কোনো বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হলে সাধারণত তার পরিবার দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে অথবা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আইনি লড়াইয়ের আবেদন করে থাকে। তবে এই দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের নীরবতা এবং মিশনের অজ্ঞতা প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি তৈরি করেছে।

























