আইজিপির ক্রসফায়ার বিষয়ক বক্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের তীব্র উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ০৮:২৩:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের সম্প্রতি দেয়া এক বক্তব্য ঘিরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। আইজিপি জানিয়েছিলেন, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতে পুলিশ পিছপা হবে না। এই বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সংস্থাগুলো বলছে, এমন মন্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ দমনের একটি বৈধ হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। অধিকার এই ধরনের বক্তব্যের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইজিপির এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও পেশাগত দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অপরাধ দমনে ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে কি পুলিশ প্রধান ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, পুলিশের মূল দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা। অথচ আইজিপি একদিকে সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইছেন, যা পরস্পরবিরোধী। তিনি আরও বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে হাঁটবে না। এমন সরকারি ঘোষণার পর পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা তৈরি করেছে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে। হাসিনার আমলে এই ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘণের দায়ে জড়িত শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং জড়িত অনেকে বিদেশে পালিয়ে আছেন।
টিআইবি জানিয়েছে, সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন এবং টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা প্রমাণ করেছে। সংস্থাটি আইজিপির এই বেপরোয়া বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে। এছাড়া, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের সমালোচনার জেরে করা অভিযোগ প্রসঙ্গে টিআইবি বলছে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ঢালাও অভিযোগ স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপপ্রয়াস। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যা ব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অতীতের এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের বিবৃতিতে দীর্ঘমেয়াদী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদেও ইতিমধ্যেই ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে অধিকার। সংস্থাটি মনে করে, শীর্ষ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার এমন মন্তব্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স প্রদানের শামিল। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে।
সবশেষে, অধিকার ও টিআইবি উভয় সংস্থাই এই ধরনের অসাংবিধানিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। সংস্থাগুলোর দাবি, ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যা কখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ হতে পারে না। বরং পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল কাজ। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আইজিপির পদ থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে টিআইবি। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না।

























