ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রাজপথে হাজারো বিক্ষোভকারী
- আপডেট সময় : ০৫:৫২:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 3
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। ফ্রান্স, আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালের রাজপথে নেমে এসেছেন হাজারো মানুষ। বিক্ষোভ দমনে বিভিন্ন দেশে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, তবে বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এই আন্দোলন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত। শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যদিও শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি এই সংখ্যা ৮ লাখ বলে দাবি করেছে। উত্তাল এই দিনে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বিক্ষোভের একাংশে উচ্চমাত্রার সহিংসতার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, কালো পোশাক পরিহিত কিছু উগ্রপন্থী পুলিশের ওপর বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেছে। তবে অধিকাংশ সময় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। প্যারিস, লিয়ঁ ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। একই ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, অভিবাসন নীতির কারণে ফ্রান্স এখন জ্বলছে বলে দাবি করেন তিনি। ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের নতুন ঢেউ। ফ্রান্সে প্রায় ১,০০০ গ্রেপ্তার ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অন্যতম আয়োজক শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি দাবি করেছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ, যার মধ্যে রাজধানীতেই ছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার। প্যারিসে তিন হাজারের বেশি মানুষকে থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। শনিবার জর্জিয়ার পেরি শহরে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, অভিবাসীদের প্রবেশের সুযোগ দেয়ার কারণে ফ্রান্স এখন ‘জ্বলছে’। ট্রাম্পের অভিযোগ, ফ্রান্সে যাওয়া কিছু অভিবাসী দেশটিকে পছন্দ করেন না, এমনকি সেখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিল্পকর্মের প্রতিও তাদের শ্রদ্ধা নেই। এ ধরনের মানুষকে দেশে প্রবেশ করতে না দেয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। বাড়ির মালিক ভাড়া ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়ার পর তাকে বাসা ছাড়তে হয়। তবে সংখ্যালঘু সরকার সংসদে বিলগুলোর অনুমোদন নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে।
কয়েক দিন ধরে চলা এই সহিংসতায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৩০০ জনের বেশি পুলিশ ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। এই আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত মে মাসে ট্রাম্প পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্প ঘিরে। এদিকে ইতালিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। দেশজুড়ে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে থানায় নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করে থানায় নেয়া হয়। শিবিরে রয়েছে খাবার বিতরণের জায়গা, চিকিৎসাকেন্দ্র ও বৈঠকের ব্যবস্থা। অন্যথায় আইন অমান্যের অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে আবাসন সংকট প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিবাদী তাঁবুর শহর। গত ২৬ সেপ্টেম্বর এক বৃদ্ধাকে উচ্ছেদের পর এই আন্দোলনের তীব্রতা পায়। সরকার দুটি জরুরি বিল উত্থাপন করলেও তা কার্যকর না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। আবাসন সংকটের চিত্রটি পর্তুগালেও সমান ভয়াবহ। দেশটিতে বাড়ির দাম ও নতুন ভাড়ার চুক্তিগুলোতে খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। রোববার লিসবনের রসিও চত্বরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের তাঁবুর শিবির উচ্ছেদ করেছে। এ সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে পুলিশ সতর্কবার্তা দিলেও বিক্ষোভকারীরা তা উপেক্ষা করেছিলেন। এক মাস আগে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া প্রতিবাদী শিবিরটি এখন বড় আকার ধারণ করেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে দীর্ঘদিনের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের পর আন্দোলনটি শুরু হয়। ২০১৭ সালের পর দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তাঁবু সরিয়ে নিতে বিক্ষোভকারীদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
পর্তুগালের বিক্ষোভকারীদের দাবি, বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ পরিবার ও তরুণদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তারা ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষার আইন ও উচ্চ ভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। ইউরোপের এই আন্দোলনগুলোতে দাবির ধরন ভিন্ন হলেও সবগুলোর মূল কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারি নীতির প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। কোথাও আবাসন সংকট, কোথাও উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা, আবার কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে এই লড়াই ইউরোপের জনজীবনকে করে তুলেছে উত্তপ্ত। ঘটনাটি আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও ভাড়াটিয়াদের দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
























