জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল বন্ধ, বিপাকে গরিব রোগীরা
- আপডেট সময় : ০৩:৫৭:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নিতে আসা রোগীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালটির মোট ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে চারটিই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। বাকি দুটি মেশিনে কোনোমতে চিকিৎসা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গত দেড় মাস ধরে নতুন কোনো রোগীর রেডিওথেরাপির জন্য নিবন্ধন বা সিরিয়াল প্রদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা নিতে আসা অসচ্ছল রোগীরা বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন। তাই নতুন রোগীদের সিরিয়াল দিতে পারছি না। রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, আর মেশিনের সংখ্যা কম থাকায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ জন এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন। দীর্ঘ অপেক্ষায় চিকিৎসা ব্যাহত হলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ও রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়ে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষায় সাড়ে সাত হাজার রোগী
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর অস্বাভাবিক চাপ এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে তারা হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার রোগী নতুন করে সিরিয়ালের অপেক্ষায় আছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পূর্বের সিরিয়ালগুলোই প্রায় ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়ে গেছে। চিকিৎসার সিরিয়াল নিয়ে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অসহায় রোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাবো না। তিনি বলেন, ‘নতুনভাবে সিরিয়ালের অপেক্ষায় আছেন সাড়ে ৭ হাজার রোগী। অনেকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যান।
ভুক্তভোগী রোগীদের দুর্ভোগ
গোপালগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, পেটে টিউমারজনিত অস্ত্রোপচারের পর তিনি কেমোথেরাপি সম্পন্ন করেছেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ হিসেবে রেডিওথেরাপির জন্য তিনি হাসপাতালে আসেন।
গত ১৯ অক্টোবর সকাল থেকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো সিরিয়াল পাননি তিনি।
মোস্তফা কামাল আক্ষেপ করে বলেন, কেমোথেরাপির পর রেডিওথেরাপি দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো সিরিয়াল পাচ্ছি না।
আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে থেরাপি নেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
কিন্তু সরকারি হাসপাতাল থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, এখন নতুন করে কোনো সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না এবং মেশিন নষ্ট থাকায় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে।
একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুন।
স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর তিনি রেডিওথেরাপি নেওয়ার জন্য জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে আসেন। কিন্তু সেখান থেকে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নতুন রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া বন্ধ রয়েছে এবং মেশিন সচল না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাথিয়া খাতুন বলেন, সরকারিভাবে থেরাপি দেওয়ার জন্য এত দূর থেকে এসেছি। এখানে এখন সিরিয়াল পাচ্ছি না। আমাকে সরকারিভাবেই চিকিৎসা নিতে হবে, কারণ বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। আমরা দিন আনি দিন খাই, দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই অনিশ্চয়তা আমাদের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা স্বরূপ।
চিকিৎসা কার্যক্রম ও তিন শিফটে সেবা
কর্তব্যরত চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগটি সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টানা তিন শিফটে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগীকে থেরাপি দেওয়ার পরও রোগীর বিপুল চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেডিওথেরাপি শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দীর্ঘ বিলম্বের ফলে রোগীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার ঝুঁকি বাড়ছে। সাধারণত একজন রোগীর থেরাপির কোর্স সম্পন্ন করতে চার থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে, যা এখন রীতিমতো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মেশিন দুটি সক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগীকে সেবা দিচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন জানান, বর্তমানে নতুন সিরিয়াল নেওয়া সম্ভব নয় কারণ ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় বরাদ্দ হয়ে আছে। তবে সরকার ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে নতুন ১৭টি রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ছয়টি ঢাকায় এবং ১১টি ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বসানো হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যন্ত্রপাতি আমদানিতে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহ্য করা হবে না এবং জীবনরক্ষাকারী এসব যন্ত্র শুল্কমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করা যায়, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নতুন মেশিন আসবে। অথচ সংকট মোকাবিলায় সরকার কেন আগেই প্রয়োজনীয় মেশিনের ব্যবস্থা করেনি, সেই প্রশ্নও উঠছে।’। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সিংহভাগ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বাস্তবতা
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অর্ধেক ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি হাসপাতালের ওপর একক চাপ না রেখে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
- কেবল মেশিন স্থাপন করলেই হবে না, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ও ফিজিসিস্টের মতো দক্ষ জনবল তৈরি করা সময়ের দাবি।
- গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হচ্ছে, যার ফলে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
- দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রোগীদের জীবনহানির ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

























