দুদক-তদন্ত ও পদত্যাগের চাপে টালমাটাল বিএনপিসহ সরকারের অন্দরমহল
- আপডেট সময় : ১১:২১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নানা বিতর্ক ও অস্বস্তিকর ঘটনার ঘনঘটা। সরকার একদিকে মিতব্যয়িতা ও স্বচ্ছতার কথা বললেও, দলের ভেতরেই বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছে, তা রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন গরিব মানুষ খুঁজে বের করার নামে সরকার দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করছে, ঠিক সেই সময়ে কোনো টেন্ডার ছাড়াই কৃষক কার্ড প্রকল্পের ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার কাজ একজনের পরিচিত প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কন্ট্রাক্ট-সাব কন্ট্রাক্ট ও ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ গত পাঁচ মাস ধরে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দমন দূরে থাক, নিয়ন্ত্রণেও আনা যাচ্ছে না মতলববাজদের। কারও চাল, ডাল, তেল, সারে কারসাজি, চালবাজি, তেলবাজিতে আখের গোছাতে যারপরনাই ব্যস্ততা। কেউ ব্যস্ত টেন্ডারসহ সরকারি কেনাকাটা, তদবিরবাজিতে শত নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা হাতানোতে। সরকারি-বেসরকারি উভয় দিকেই বিনিয়োগ-নিয়োগে বন্ধ্যাত্ব। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মন্থর গতি, আয় বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপ এবং সরকারি ঋণের বোঝা বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি করছে উদ্বেগ। কোনো আইটেমই হাতছাড়া করছে না তাদের সিন্ডিকেট। অর্থ, বিমানসহ আরও কয়েক মন্ত্রীর সন্তান, স্বজন-পরিজনদের দুর্নীতিও ব্যাপক প্রচারিত। কিছু রাখছে নিজেদের তথ্যের সিন্দুকে।
স্বাস্থ্যখাতের প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের জন্য ৩৪২ কোটি টাকা মূল্যের ট্যাবলেট বা প্যাড কেনার প্রক্রিয়াটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাতিজার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। পাশাপাশি, গ্যাস সংকটের সুযোগ নিয়ে সাগরে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে বিএনপির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমপি মুশফিকুর রহমানের নাতির বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও বেশ জোরেশোরে প্রচার পাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়ী ও স্বচ্ছ শাসনের অঙ্গীকারকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জামায়াত এবং এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এসব অভিযোগের সপক্ষে তথ্য-প্রমাণ বিভিন্ন জায়গায় দাখিল করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবিরাম দিচ্ছে মন্দ আভাস।
ধারাবাহিক এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকার কিছুটা নমনীয় বা চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। গুরুতর অভিযোগে কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হলেও, মূলত রাজনৈতিক ও আইনি জবাবদিহির চাপ থেকেই এসব পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর তার এই পদত্যাগ সরকারের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংকট সামলানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শঙ্কা রয়েছে। আগামী কয়েক বছরে নতুন লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকের বেকার হওয়ার শঙ্কা। সামগ্রিক অর্থনীতির চাপ চ্যাপ্টা করে ফেলছে দেশকে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে অর্থনীতির ওপর চাপ। কয়েক মন্ত্রী-এমপির পরিবারকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর আই হ্যাভ আ প্ল্যান, মিতব্যয়, নামমাত্র খাওয়া-দাওয়ার প্রচারকে মাঠে মেরে ফেলছে।
এর আগে ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন। ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ ছাড়েন জহির উদ্দিন স্বপন। এর পেছনে ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ কাজ করেছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনার পর তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশে তাকে পদত্যাগ করতে হয় এবং ১ অক্টোবর তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে। সব মিলিয়ে ধারাবাহিক এই পদত্যাগগুলো বিএনপি ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। নানান সূত্রের তথ্যমতে, তিনি আসলে ফিরছেন না। ২৪ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এমন উদ্বেগজনক অর্থনৈতিক অবস্থার মাঝেও লুটপাটের মচ্ছব থেকে সরছে না মতলববাজরা।

























