নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে লন্ডনের মার্কিন দূতাবাসে ৪০০ জনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা
- আপডেট সময় : ১০:৫৩:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নামের সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বড় ধরনের গণপ্রতিবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আগামী ৩১ অক্টোবর লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে চার শতাধিক মানুষ জমা হয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিবাদ জানাবেন। একই দিনে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের সামনেও একই ধরনের কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা করেছেন ৪০০ জনের বেশি মানুষ। ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে গোষ্ঠীটির আগের এক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তেরেসার সঙ্গে কথা বলেছিল আলজাজিরা। সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী দল ম্যাসিভ অ্যাটাকের রব ডেল নাজা, ৯৪ বছর বয়সি মানবাধিকার আইনজীবী মার্গারেট ওয়েন, সাবেক সরকারি উপদেষ্টা জোনাথন পোরিট এবং রেভারেন্ড সু পারফিট। কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নইলে আমাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’।
বিক্ষোভকারীরা দাবি তুলেছেন যে, তারা গণহত্যার বিরোধিতা করেন এবং প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কার্যক্রমকে সমর্থন জানান। কর্মসূচির আয়োজক সংগঠন ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস জানিয়েছে, সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এটি তাদের সর্বশেষ বড় আকারের প্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীরা হাতে এমন প্ল্যাকার্ড বহন করবেন, যাতে লেখা থাকবে, ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি। নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আলজাজিরাকে তেরেসা বলেন, ‘গাজার জন্য এভাবে প্রতিবাদ করতে পারা সম্মানের বিষয়।’। তিনি আরো বলেন, ‘আমি কী বলছি, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর অভিযোগে অন্তত ৩ হাজার ৮৫০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই বিক্ষোভের তারিখ নির্ধারণের পেছনে রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
গত জুনে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত সরকারের পক্ষে রায় প্রদান করেন এবং এর আগে হাইকোর্টের দেওয়া একটি রায় বাতিল করে দেন, যেখানে নিষেধাজ্ঞাটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছিল। আগামী ৪ ও ৫ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরির আপিলের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা জারির পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ছিল। স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পের টার্নবেরি গলফ মাঠে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীদের রং ছিটানোর একটি ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প সরাসরি ট্রুথ সোশ্যালে সেটিকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, ওই ঘটনার আগে ট্রাম্প এবং তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মধ্যে দুইবার ফোনালাপ হয়েছিল। এমনকি নিষেধাজ্ঞার আগে এরিক ট্রাম্প স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনির সাথে বৈঠক করেছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্টারমার স্কটল্যান্ডের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রেপ্তারের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তথ্য অধিকার আইনে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ওই বৈঠকে টার্নবেরির প্রতিবাদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। নিউ স্টেটসম্যান সাময়িকীর প্রচ্ছদে প্রকাশিত ওই চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের কাছে ‘কঠোর’ আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
এই ইস্যুতে আইনি জটিলতাও বাড়ছে। গ্লাসগোর হাইকোর্টে ৩১ অক্টোবর বিক্ষোভের তিন দিন পরেই টার্নবেরি গলফ মাঠের ঘটনায় অভিযুক্ত সাতজনের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কৌঁসুলিরা তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সাজা দেওয়ার আবেদন জানালেও অনেকে একে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা করছেন।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সরব হয়েছেন। অভিনেতা পল মেসকাল, জেসি বাকলি, সুসান সারান্ডন এবং সম্প্রচারক গ্যারি লিনেকারসহ অনেকে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। এমনকি লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা শামি চাকরাবর্তী এলবিসি রেডিওর এক সাক্ষাৎকারে এই আইনকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। এলবিসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক এই ছায়া অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নিষেধাজ্ঞাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে হাস্যকর করে তুলছে।
শামি চাকরাবর্তী সতর্ক করে বলেছেন যে, বর্তমানে যে কাউকে গ্রেপ্তার করার ভয় রয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। এদিকে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিসের দাবি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সদস্যরা কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেছেন। তারা মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের শুনানির আগে এই গণপ্রতিবাদ এবং সম্ভাব্য গণগ্রেপ্তার মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবে। ডিফেন্ড আওয়ার জুরিসের মতে, এ ঘটনা দেখায় যে নিষেধাজ্ঞা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এলবিট সিস্টেমসের মতো অস্ত্র নির্মাতাদের স্থাপনায় ঢুকে পড়া ও ক্ষয়ক্ষতির মতো কর্মকাণ্ডের কারণেই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিপরীতে, সমালোচকরা সরকারের এই বৈষম্যমূলক আচরণের প্রমাণ হিসেবে লেখক সারাহ হেলমের উদাহরণ টানেন, যিনি সংগঠনটিকে সমর্থন করার পরও পুলিশি ব্যবস্থা থেকে রেহাই পেয়েছেন। ইসরাইলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
আইনজীবীদের মতে, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে গোপন ছোট সেলের মাধ্যমে পরিচালিত সংগঠন হিসেবে গণ্য করা হলেও প্রকৃত অর্থে আন্দোলনটি অনেক বেশি ব্যাপক এবং এর সাথে আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনির মতো অনেকে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
























