বিশ্বজুড়ে ঋণের পাহাড়: শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম
- আপডেট সময় : ০৮:১২:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, যা বর্তমানে ৩৬৫ লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। কেবল ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ ১০ লাখ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। এই বিশাল ঋণের বোঝা সরকার, পরিবার এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সমষ্টি।
তালিকায় শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যাদের মোট ঋণের পরিমাণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার।
এটি দেশটির জিডিপির ১২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীন ও জাপানের ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার এবং ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। বিশেষ করে জাপানের ঋণের অনুপাত তাদের জিডিপির তুলনায় ১৯৯ শতাংশ, যা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, ভারত, কানাডা ও ব্রাজিল শীর্ষ ১০টি ঋণগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১০৪ শতাংশ। ষষ্ঠ অবস্থানে ইতালির ঋণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে সপ্তম অবস্থানে জার্মানির ঋণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সরকারি ঋণের তালিকায় ৪৫তম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ। যদিও বড় অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ কম, তবুও টেকসই অর্থনীতির জন্য ঋণের অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। চতুর্থ অবস্থানে যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১০২ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ভারতের সরকারি ঋণ ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৮৩ শতাংশ।
বৈশ্বিক ঋণ সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো সুদ পরিশোধের ব্যয়। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। এই অর্থ বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের (৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার) চেয়েও বেশি। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের তুলনায় এই সুদ পরিশোধের অঙ্ক বেশ উদ্বেগজনক। নবম অবস্থানে কানাডার ঋণ ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার এবং দশতম অবস্থানে ব্রাজিলের ঋণ ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার। সুদের পেছনে ব্যয় ৩৩ লাখ কোটি ডলারের বেশি বিশ্বে ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ যদি সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ কমে যায়। সুদের বোঝা সামলাতে সরকারকে করের হার বৃদ্ধি অথবা উন্নয়নমূলক ব্যয় সংকোচনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কিছু জায়গায় সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
ইউরোপের দেশগুলোতে ঋণের চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্সে পরিস্থিতি বেশ নাজুক, যেখানে গত শনিবারে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। বর্তমানে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশ, যা জার্মানির ৩ দশমিক ৪১ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। ২০০২ সালের পর থেকে ফ্রান্সে ঋণের সুদের হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। এর আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোপীয় ঋণ সংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে উচ্চ সুদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে তখন আর্থিক সহায়তাও নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল। এতে দেশটির সরকারি আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হতে পারে।
সাধারণত সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য ঋণপত্র বা বন্ড ইস্যু করে। ঋণের বাজার অস্থিতিশীল হলে বা বন্ডের দাম কমলে সুদের হার বেড়ে যায়, যা নতুন ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তোলে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরও। সরকারি সুদের হার বাড়লে বাড়ি কেনা বা গাড়ির ঋণের মতো ব্যক্তিগত ঋণের খরচও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা পরিশোধ এবং একইসঙ্গে জনসেবামূলক কার্যক্রম সচল রাখা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের সুদের এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা চাইছেন। বিনিয়োগকারীরা এসব ঋণপত্র কিনে সরকারকে অর্থ দেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান।






















