যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মুখে ট্রাম্প
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 2
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে এবং ভোটারদের বড় একটি অংশ তাঁর নেতৃত্বের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য এক ‘ঐতিহাসিক পরাজয়’ অপেক্ষা করছে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ‘রিয়েল টাইম’ উপস্থাপক বিল মাহের পডকাস্টে মন্তব্য করেন, ট্রাম্প আর আগের সেই ‘কিং কং’ নন এবং ভোটাররা ব্যালট বাক্সে তাঁদের অসন্তোষের প্রকাশ ঘটাবেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিপর্যয় ডেমোক্র্যাটদের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে না; বরং ভোটাররা প্রধানত ট্রাম্পের নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধী পক্ষে ভোট দিচ্ছেন।
রয়টার্স ও ইপসোসের ১৯ অক্টোবরের চার দিনব্যাপী প্রকাশিত জরিপ থেকে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে মাত্র ৩১ শতাংশ নাগরিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন, যা গত দুই সপ্তাহের তুলনায় ১ শতাংশ পয়েন্ট কম। একই জরিপে উঠে এসেছে, যদি আজ নির্বাচন হয়, তবে ৪৭ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীকে ভোট দেবেন, যেখানে রিপাবলিকানদের সমর্থনে আছেন মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোটার। ডেমোক্র্যাটদের এই ১২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান বর্তমান নির্বাচনী চক্রে সর্বোচ্চ, যা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে বেশ জোরালো করেছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের জনপ্রিয়তা বেশি, যেখানে ৫০ শতাংশ ভোটার তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে আছেন মাত্র ৩২ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটদের এই ১২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান চলতি নির্বাচনী চক্রে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ, যা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথকে আরও জোরালো করে তুলেছে। একের পর এক প্রকাশ পাওয়া জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থনে রেকর্ড ধস দেখা গেছে এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। এটি তাঁর দুই মেয়াদে সর্বনিম্ন অনুমোদনের হার। একই সুর ধ্বনিত হয়েছে নির্দলীয় বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট’-এর মূল্যায়নেও। রিপাবলিকানদের প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের অবশিষ্ট দুই বছরের অর্থনৈতিক ও আইনি এজেন্ডা বাস্তবায়নকে চরম কোণঠাসা করে ফেলবে।
বিভিন্ন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের জরিপেও একই ধরনের চিত্র ফুটে উঠেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৮ অক্টোবরের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি সন্তুষ্টির হার মাত্র ৩০ শতাংশ এবং ৬৮ শতাংশ নাগরিক তাঁর কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। এপি-এনওআরসির ১ অক্টোবরের জরিপে ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের নেওয়া ভূমিকার বিরোধিতা করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে সামরিক অভিযানের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এই বড় ধস নেমেছে। অর্থনীতি সামলানোয় ব্যর্থতার জন্য ৬৮ শতাংশ নাগরিক তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশ নিজেকে রিপাবলিকান সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পিউ রিসার্চের মতে, প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের উর্ধ্বমুখী দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্ষতিকর শুল্কনীতি এবং বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম মার্কিন ভোটারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি করেছে। একই চিত্র ধরা পড়েছে অন্যান্য প্রধান জরিপগুলোতেও।
নির্বাচনী বিশ্লেষণেও রিপাবলিকানদের নাজুক পরিস্থিতির প্রমাণ মিলছে। জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ডেভিড ওয়াসারম্যানের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটরা ৪৯ শতাংশ এবং রিপাবলিকানরা ৪৭ শতাংশ সমর্থনে এগিয়ে আছে, অথচ গত ২০২৪ সালের নির্বাচনে এসব এলাকা ট্রাম্পের দখলে ছিল। সম্পাদক এরিন কোভি ১৬ অক্টোবরের এক বিশ্লেষণে ওহাইও, নেব্রাস্কা ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান ঘাঁটির ১১টি আসনের অবস্থান পরিবর্তন করে ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে রেখেছেন। ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর মাঝেও বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে; ২০২৪ সালে তাঁকে ভোট দেওয়া ৯৫ শতাংশ নাগরিকের মধ্যে এখন মাত্র ৬৭ শতাংশ তাঁর পাশে আছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে দুই দলের প্রতিই অসন্তুষ্ট ভোটারদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং ৩ নভেম্বরের কেন্দ্রভিত্তিক ভোটার উপস্থিতির ওপর।
























