স্থানীয় সরকারের ৬৬ খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
- আপডেট সময় : ১০:৪৭:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 7
স্থানীয় সরকার খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে গত ১৭ বছরে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সরকারি তদন্তে। সড়ক-কালভার্ট নির্মাণ, সরকারি নিয়োগ, ঠিকাদারি বিল, ভ্যাট-কর আদায় থেকে শুরু করে বাজার ও মার্কেটের ভাড়াসহ ৬৬টি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। অধিকতর নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজনে গত ১৯ অক্টোবর প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে হস্তান্তর করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
তদন্ত কমিটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমার কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর এবং পরবর্তী সময়ের কার্যক্রমগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা ওয়াসার নথিপত্র, অডিট প্রতিবেদন ও পূর্ববর্তী বিভিন্ন তদন্ত পর্যালোচনার সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, পিরোজপুরে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এর বাইরেও প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, গাড়ি কেনা ও মেরামতের নামেও ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে। যেমন—গাড়ি মেরামত বাবদ চালকের ব্যাংক হিসাবে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা প্রদান এবং অননুমোদিত জনবল কাঠামোয় ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকার বেতন-ভাতা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও সরকারি নকশা অবজ্ঞা করে সড়ক নির্মাণ এবং পাঁচটি কালভার্ট না বানিয়েই ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
সিটি করপোরেশনগুলোর রাজস্ব ও ভাড়া আদায়েও বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রোড কাটিং ফি-এর ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট জমা না দেওয়ায় দণ্ডসুদসহ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সিটি করপোরেশনে ২০১৫-১৭ সালের ভ্যাট কর্তন ও জমার হিসেবে আরও ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার অসংগতি মিলেছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে। একই সিটি করপোরেশনের ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আরও কিছু কাজ ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট কর্তন এবং জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নির্মাণকাজে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কেট ও স্থাপনা ভাড়া আদায়সংক্রান্ত খাতে আত্মসাতের ঘটনা সবচেয়ে বড়। ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের বাজার বা স্থাপনা ভাড়া থেকে ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে ট্রেড লাইসেন্স ফি বাবদ ১১ কোটি ৪৫ লাখ এবং কমিউনিটি সেন্টার ও দোকানের ভাড়া না পাওয়ার কারণে ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনে ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের ঘটনাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাবেক মেয়রদের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ এসেছে তদন্তে।
গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এবং সিটি করপোরেশনের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়াসহ ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অনিয়ম পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।
বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদকালে নিয়োগ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রমেও কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির নজির পাওয়া গেছে। কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নসরুলের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও পানির গুণগতমান পরীক্ষা প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধে অনিয়ম পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৩-এর অর্থ ব্যবহারে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। শতাধিক ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলেও তাদের কাছ থেকে বিলম্বজনিত জরিমানা আদায় করা হয়নি, বরং বড় অংশ মওকুফ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ আসা মানেই আদালতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে দুদকের মাধ্যমে অধিকতর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া একান্ত প্রয়োজনীয়।

























