খুলনায় ২৫ মাসে ২২৫ মৃত্যুর ঘটনা: অপরাধের স্বর্গরাজ্যে আতঙ্কিত জনজীবন
- আপডেট সময় : ০৮:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী খুলনা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিন যতো যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বাড়ছে খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও লুটপাটের মতো ঘটনা। পথে-ঘাটে হানা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হানা দিচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। অপরাধের সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় খোদ পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আবার কেউ কেউ ভয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলা ও মহানগরীতে মোট ২২৫ জনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। অপরাধীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহারে প্রায় প্রতিদিনই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই বাণিজ্যিক নগরীতে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব বাড়ছে প্রতিদিন। আজ বৃহস্পতিবারও (৫ নভেম্বর) নতুন আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। ঘটনার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ২৬ অক্টোবর রাত থেকে ২৭ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত খুলনায় গুলির তিনটি ঘটনা ঘটে। ২২ অক্টোবর খুলনায় ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রায় আধাঘণ্টা পর তিনি নিজেই অফিসে ফিরে আসেন।
ছিনতাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও। লোকচক্ষুর আড়ালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে উপেক্ষা করে শহরের অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে খুলনা নগরীর শিরোমণি পুলিশ লাইন্সের কাছে তিন অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীর হামলায় শাহ আলম (৪৩) নামে এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় খুলনাজুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। খোদ পুলিশ কর্মকর্তা যেখানে সুরক্ষিত নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যা নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন পুলিশ যদি নিরাপত্তহীনতায় ভোগে তাহলে সানুষের নিরাপত্তা কোথায়।
পুলিশ জানিয়েছে, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছে। বিদেশে বসেই তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুলনার অপরাধজগতের ‘কাঠি নাড়ছে’ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তির কাছে থেকে বিদেশি নম্বর দিয়ে চাঁদা দাবি করছে। তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও অপরাধের মাত্রা কমছে না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার জামিন পেয়ে বেপরোয়া হচ্ছেন অপরাধীরা। আদালত সামগ্রিক বাস্তবতা এবং অপরাধের ধরনের কথা বিবেচনা করে জামিনের বিষয়টি আরো সতর্ক বিবেচনায় নিতে পারেন। গণআন্দোলনের ফলে একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের যে আকাঙ্খা মানুষের মাঝে তৈরী হয়েছিলো, সেটি বাস্তবায়নের ধীরগতি মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও অস্ত্রের তাণ্ডব
এক সময়ের শান্ত খুলনা এখন প্রকাশ্যে গুলি কিংবা হত্যাচেষ্টার নিত্যকার ঘটনায় আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। রূপসা উপজেলার আঠারোবেকি নদীর চরে গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে স্থানীয় লোকজনের খবরের ভিত্তিতে পুলিশ জোড়া মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে—একজন মেহেদী হাসান (৩৫) এবং অন্যজন রেজাউল করিম (৩০)। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এরা দুজনই খুলনার অপরাধজগতের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গড়া ‘বি-কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দুজনের শরীরেই একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে পরিনত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরও একটি মরদেহ দেখতে পায়। ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় একটি চায়ের দোকানের ভেতরে ঢুকে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে গত ১৫ আগস্ট কুপিয়ে হত্যা করা হয় জয় ঢালী নামের এক যুবককে। জয় ঢালীর বাবা আক্তার ঢালীকেও এর ঠিক দুই মাস আগে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। নিহত আক্তার ঢালী রূপসার একজন বাস শ্রমিক ছিলেন। তিনি ছেলেকে হত্যার ঘটনায় মামলা করার পর ক্রমাগত হুমকি পেয়ে থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একসময় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন তিনি। নিহত তরিকুল ইসলাম শেখ ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। স্থানীয়রা বলেন, নিহত ঘের ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন।
অন্যান্য ঘটনার মধ্যে গত ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা বাইপাস মোড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে একজন নিহত ও দুজন আহত হন। এ ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় গত রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খুন হন খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। আর শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে মহানগরীর লবণচরা এলাকার সড়ক থেকে এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
- আড়ংঘাটা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে এনামুল শেখ নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।
- গুলিবর্ষণের ঘটনায় যোগীপোল ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মামুন শেখ এবং স্থানীয় বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন গুরুতর আহত হন।
- আহত দুজনকে আশঙ্কাজনক ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ২৫ অক্টোবর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু নামের এক কলেজশিক্ষককে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে ও ১০ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে খুলনা নগরীর কাশিমনগর তিন নম্বর সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আশিকুজ্জামান জনি (৩৪) নামে এক যুবক আহত হন। তার তিন দিন আগে, ৭ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে অফিস থেকে বের হওয়ার পর প্রকাশ্যে রিকশায় করে তুলে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। আগস্টের শুরুতে বিএল কলেজের গেটে গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক এবং নগরের বিএল কলেজ এলাকার একটি মসজিদেও গুলিবর্ষণে দুজন আহত হন। এ সময় দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলযোগে খুলনা-দৌলতপুর সড়ক হয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি
খুলনায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশাসনিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরোনো অপরাধী চক্রগুলো। ধারাবাহিক এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরাও। গত দুই বছরে খুলনায় অন্তত এক ডজন বিএনপি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ধারাবাহিক এমন হত্যা আর গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কে খুলনাবাসী। আর এই ভয়ের রাজত্বে একটি চক্র চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে পিটুনিতে মারা যান বিএনপি কর্মী বাবুল মোল্লা। ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়ার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ খানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মানিক হাওলাদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ১১ জুলাই নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় আরেক বিএনপি কর্মীকে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিন মোল্লা বোয়িংকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়, যার পর ৪ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিউজ্জামান মনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
পুলিশের পরিসংখ্যান ও যৌথ অভিযান
পুলিশের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ মাসে খুলনায় অন্তত ৭৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে খুলনা মহানগরী এলাকায় ৩৭টি এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এই সময়ে পরিচালিত বিভিন্ন বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অর্ধ শতাধিক অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ কাজ করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, খুলনা জেলার ৯টি থানার মধ্যে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা—এই চার থানাকে অপরাধের দিক থেকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং ‘ব্লক রেইড’ জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি রূপসা উপজেলায়। তিনি বটিয়াঘাটায় জিএমআই গ্যাস কোম্পানিতে অপারেটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান জানান, অপরাধীদের দমনে পুলিশের তৎপরতা থেমে নেই। যখনই কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটছে, পুলিশ দ্রুত তা উদঘাটন করে আসামিদের গ্রেফতার করছে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করছে।
























