ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া কোনো স্লোগান নয়, পরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজার ও উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতেই সয়াবিনের দাম সমন্বয় : বাণিজ্যমন্ত্রী শিশু নিখোঁজ সম্পর্কে পুলিশের ব্যাখ্যা এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে : জাতিসংঘ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনার গুলিতে ২ কিশোর নিহত : ফিলিস্তিন মেসির সম্মানে এক মিনিট করতালি নভেম্বরে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মুখোমুখি ব্রাজিল-জাপান সিরিয়ার কাছেও হারল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানো হবে: বিসিবি

বাঙালির আনন্দ শোভাযাত্রা: সম্প্রীতির মহোৎসব

  • আপডেট সময় : ১২:৪০:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৫
  • / 877
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পুরোনোর গ্লানি মুছে নতুনকে স্বাগত জানাতে বছর ঘুরে আবার এসেছে বাঙালির জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ মানে বৈশাখ মাসের ১ তারিখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।

গোটা বিশ্বের সব প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালি অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে থাকে। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ হিসাবে পালিত হয়।

ত্রিপুরা ও আসামেও বাঙালিরা ধুমধাম করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। সে হিসাবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসব হিসাবে বিবেচিত। সমগ্র বিশ্বের বাঙালি নাড়ির টানে পহেলা বৈশাখের উৎসবে শামিল হয়। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৫ এপ্রিল ভারতে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়।

মোগল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষে এই পহেলা বৈশাখ মানে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এটা তিনি বাঙালির চিরায়ত জীবনধারার সংস্কৃতিকে মূল্য দেওয়ার জন্য করেননি, করেছিলেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ১৫৮৪ সালের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়।

প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে পহেলা বৈশাখ হয়েছে। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে কালপরিক্রমায় যোগ হয় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, পান্তা-ইলিশ, নৌকাবাইচ, বইমেলা, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা, জারি-সারি, পুঁথি পাঠসহ নানা ধরনের লোকজ আনন্দ উৎসব।

বাংলার প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজের জীবনধারায় পহেলা বৈশাখের শিকড়ের সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায়। শুরুতে বছরের পহেলা দিন হিসাবে এর গুরুত্ব ছিল ভিন্ন ধরনের। গ্রামবাংলার কৃষকরা বৈশাখ মাসের প্রথম দিন খেতের কয়েক গোছা ধান কেটে মাথায় করে বাড়িতে এনে সযত্নে ঘরের চালে গুঁজে রাখত। এটা করত মূলত ফসল কাটার উদ্বোধন হিসাবে। পাশাপাশি ওই দিন বাড়িতে মা-চাচি-খালারা ভালো কিছু রান্না করত, যাতে বছরের প্রথম দিনের মতো তার ছেলেমেয়েরা সারা বছর দুধে-ভাতে ভালো থাকে।

অন্যদিকে কৃষকরা মেলার আনন্দ সংগীতের সঙ্গে ফসল কাটার মৌসুম উদযাপন করত। এ ঐতিহ্যটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রভাবে বিবর্তিত হয়ে বহুমাত্রিক হয়ে যায়। ফলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালি ঘরে-বাইরে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। পহেলা বৈশাখ শুধু আনন্দ নয়, বাংলাদেশে ঐক্য ও বৈচিত্র্যের প্রতীক।

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে পহেলা বৈশাখকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা চেয়েছিল, শাসন-শোসনের সুবিধার্থে বাঙালিদের ওপর তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে। কিন্তু ব্রিটিশদের সে প্রয়াস সফল হয়নি বরং তাদের ওই প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি জাতিসত্তায় দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা শাসকরা বাঙালি জাতিসত্তার বিনাশ সাধনে নানা কূটকৌশল গ্রহণ করতে শুরু করলে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা ক্রমেই রাজনৈতিক রূপলাভ করে। ওই সময় থেকেই এদেশে ক্রমান্বয়ে সংগঠিতভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়, যা পরে বাঙালির জীবনধারায় সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধন করে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আজকের বাংলাদেশ। পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে সারা দেশে অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়।

সুতরাং পহেলা বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা জাতি একাত্ম হয়ে যায়। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসব। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পহেলা বৈশাখ জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পায়।

এবার দিনটি পূর্বের ঐতিহ্যবাহী নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে শুরু হয়। আনন্দ শোভাযাত্রা রঙিন মুখোশ ও পুতুল থাকে, যা বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে চিত্রিত করে। এছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাদ্যমেলা এবং অন্যান্য কার্যক্রম মানুষকে একত্রিত করে এবং সম্প্র্রীতি ও শান্তির বার্তা দেয়। পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি বাঙালির আনন্দ ও আশাবাদকে প্রতিফলিত করে। ছেলেদের ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা পাঞ্জাবি, ফতুয়া এবং মেয়েদের লাল পাড় সাদা শাড়ি বৈশাখী ফ্যাশন।

পহেলা বৈশাখ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের পাশাপাশি কিছু রকমারি খাবারের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে পান্তা-ইলিশ, আমডাল, লাবড়া-সবজি ডালপুরি, বেগুনিসহ নানা পদের ভর্তা, মাংস, দই, রসগোল্লা অন্যতম। মিষ্টি রসগোল্লা এবং মিষ্টি দই পহেলা বৈশাখের খাবারের একটি অপরিহার্য অংশ, যা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপহার হিসাবে বিনিময় করা হয়।

সংগীত ও নৃত্যও পহেলা বৈশাখের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারা দিন বিভিন্ন ধরনের লোক ও শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ‘বাউল গান’, যা গ্রামবাংলায় ভাব-রহস্যবাদ, কবিতা ও সুরের এক অনন্য মিশ্রণ। বর্তমানে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই শুরু হয় বাঙালিয়ানার নানা রকমের প্রস্তুতি। আগেভাগেই বাঙালি মন প্রস্তুত থাকে নানা আয়োজনে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে।

পহেলা বৈশাখ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হয়। তাই ২০১৬ সালে ইউনেস্কো পহেলা বৈশাখকে মানবতার ‘মৌখিক এবং অস্পষ্ট ঐতিহ্যের মাস্টারপিস’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

পহেলা বৈশাখ ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। অনেক দোকান ও বাজার এদিন গ্রাহকদের পুরোনো লেনদেন চুকিয়ে নতুন করে শুরু করার জন্য হালখাতার আয়োজন করে। দিনটিকে নতুন উদ্যোগ ও বিনিয়োগের জন্য শুভ বলে মনে করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পহেলা বৈশাখ বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষ এ মহোৎসবে শামিল হয়। তাই বাঙালির এই পহেলা বৈশাখ সম্প্রীতি ও মানবতার মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে, আগামীতে আরও হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বাঙালির আনন্দ শোভাযাত্রা: সম্প্রীতির মহোৎসব

আপডেট সময় : ১২:৪০:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৫

পুরোনোর গ্লানি মুছে নতুনকে স্বাগত জানাতে বছর ঘুরে আবার এসেছে বাঙালির জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ মানে বৈশাখ মাসের ১ তারিখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।

গোটা বিশ্বের সব প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালি অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে থাকে। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ হিসাবে পালিত হয়।

ত্রিপুরা ও আসামেও বাঙালিরা ধুমধাম করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। সে হিসাবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসব হিসাবে বিবেচিত। সমগ্র বিশ্বের বাঙালি নাড়ির টানে পহেলা বৈশাখের উৎসবে শামিল হয়। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৫ এপ্রিল ভারতে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়।

মোগল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষে এই পহেলা বৈশাখ মানে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এটা তিনি বাঙালির চিরায়ত জীবনধারার সংস্কৃতিকে মূল্য দেওয়ার জন্য করেননি, করেছিলেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ১৫৮৪ সালের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়।

প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে পহেলা বৈশাখ হয়েছে। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে কালপরিক্রমায় যোগ হয় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, পান্তা-ইলিশ, নৌকাবাইচ, বইমেলা, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা, জারি-সারি, পুঁথি পাঠসহ নানা ধরনের লোকজ আনন্দ উৎসব।

বাংলার প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজের জীবনধারায় পহেলা বৈশাখের শিকড়ের সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায়। শুরুতে বছরের পহেলা দিন হিসাবে এর গুরুত্ব ছিল ভিন্ন ধরনের। গ্রামবাংলার কৃষকরা বৈশাখ মাসের প্রথম দিন খেতের কয়েক গোছা ধান কেটে মাথায় করে বাড়িতে এনে সযত্নে ঘরের চালে গুঁজে রাখত। এটা করত মূলত ফসল কাটার উদ্বোধন হিসাবে। পাশাপাশি ওই দিন বাড়িতে মা-চাচি-খালারা ভালো কিছু রান্না করত, যাতে বছরের প্রথম দিনের মতো তার ছেলেমেয়েরা সারা বছর দুধে-ভাতে ভালো থাকে।

অন্যদিকে কৃষকরা মেলার আনন্দ সংগীতের সঙ্গে ফসল কাটার মৌসুম উদযাপন করত। এ ঐতিহ্যটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রভাবে বিবর্তিত হয়ে বহুমাত্রিক হয়ে যায়। ফলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালি ঘরে-বাইরে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। পহেলা বৈশাখ শুধু আনন্দ নয়, বাংলাদেশে ঐক্য ও বৈচিত্র্যের প্রতীক।

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে পহেলা বৈশাখকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা চেয়েছিল, শাসন-শোসনের সুবিধার্থে বাঙালিদের ওপর তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে। কিন্তু ব্রিটিশদের সে প্রয়াস সফল হয়নি বরং তাদের ওই প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি জাতিসত্তায় দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা শাসকরা বাঙালি জাতিসত্তার বিনাশ সাধনে নানা কূটকৌশল গ্রহণ করতে শুরু করলে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা ক্রমেই রাজনৈতিক রূপলাভ করে। ওই সময় থেকেই এদেশে ক্রমান্বয়ে সংগঠিতভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়, যা পরে বাঙালির জীবনধারায় সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধন করে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আজকের বাংলাদেশ। পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে সারা দেশে অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়।

সুতরাং পহেলা বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা জাতি একাত্ম হয়ে যায়। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসব। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পহেলা বৈশাখ জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পায়।

এবার দিনটি পূর্বের ঐতিহ্যবাহী নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে শুরু হয়। আনন্দ শোভাযাত্রা রঙিন মুখোশ ও পুতুল থাকে, যা বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে চিত্রিত করে। এছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাদ্যমেলা এবং অন্যান্য কার্যক্রম মানুষকে একত্রিত করে এবং সম্প্র্রীতি ও শান্তির বার্তা দেয়। পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি বাঙালির আনন্দ ও আশাবাদকে প্রতিফলিত করে। ছেলেদের ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা পাঞ্জাবি, ফতুয়া এবং মেয়েদের লাল পাড় সাদা শাড়ি বৈশাখী ফ্যাশন।

পহেলা বৈশাখ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের পাশাপাশি কিছু রকমারি খাবারের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে পান্তা-ইলিশ, আমডাল, লাবড়া-সবজি ডালপুরি, বেগুনিসহ নানা পদের ভর্তা, মাংস, দই, রসগোল্লা অন্যতম। মিষ্টি রসগোল্লা এবং মিষ্টি দই পহেলা বৈশাখের খাবারের একটি অপরিহার্য অংশ, যা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপহার হিসাবে বিনিময় করা হয়।

সংগীত ও নৃত্যও পহেলা বৈশাখের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারা দিন বিভিন্ন ধরনের লোক ও শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ‘বাউল গান’, যা গ্রামবাংলায় ভাব-রহস্যবাদ, কবিতা ও সুরের এক অনন্য মিশ্রণ। বর্তমানে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই শুরু হয় বাঙালিয়ানার নানা রকমের প্রস্তুতি। আগেভাগেই বাঙালি মন প্রস্তুত থাকে নানা আয়োজনে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে।

পহেলা বৈশাখ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হয়। তাই ২০১৬ সালে ইউনেস্কো পহেলা বৈশাখকে মানবতার ‘মৌখিক এবং অস্পষ্ট ঐতিহ্যের মাস্টারপিস’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

পহেলা বৈশাখ ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। অনেক দোকান ও বাজার এদিন গ্রাহকদের পুরোনো লেনদেন চুকিয়ে নতুন করে শুরু করার জন্য হালখাতার আয়োজন করে। দিনটিকে নতুন উদ্যোগ ও বিনিয়োগের জন্য শুভ বলে মনে করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পহেলা বৈশাখ বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষ এ মহোৎসবে শামিল হয়। তাই বাঙালির এই পহেলা বৈশাখ সম্প্রীতি ও মানবতার মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে, আগামীতে আরও হবে।