ঢাকা ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের ভালো সাড়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের ভালো সাড়া মিষ্টির শূন্য আসনে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন: ইসি বিএনপি জোটেরই থাকবে শূন্য হওয়া সংরক্ষিত নারী আসন: ইসি ক্যাশলেস লেনদেনে বাংলা কিউআর ব্যবহার হবে সম্পূর্ণ ফ্রি শুক্রবার ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে রূপপুর প্রকল্পের বাড়তি ইউরেনিয়াম জ্বালানি মেট্রো রেলের দুই লাইন নির্মাণে ৪৬ হাজার কোটি টাকা স্বৈরাচার শুধু নিজেদের উন্নয়ন করেছে: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি টঙ্গীর তুরাগ নদে নিখোঁজের ২৩ ঘণ্টা পর দুই শিশুর

রক্তাক্ত স্বামীর লাশ ফেলে কোলের শিশুকে নিয়ে প্রাণে বেচেঁ আসলেন মিনারা

  • আপডেট সময় : ১০:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০১৭
  • / 314
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বশির আলমামুন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ  চার বছর আগে মিয়ানমারের মংডু জেলার ধুমবাইয়ের পল্লি চিকিৎসক আয়াতুল্লাহর সাথে বিয়ে হয় মিনারা বেগমের (১৮)। বিয়ের এক বছরের মাথায় কোলজুড়ে আসে এক শিশুসন্তান। স্বামী-ছেলেকে নিয়ে সুখেই কাটছিল মিনারার দিন। আর সেই স্বামীকে চোখের সামনেই বার্মার মগ সেনা ও বর্বর মগদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হতে দেখেছে মিনারা। এই কঠিন  সময়ে স্বামীর রক্তাক্ত নিথর দেহ ফেলে একমাত্র ছেলের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে মিনারাকে। স্বামীর দেহ ছুঁয়ে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলারও সময় পায়নি সদ্য কৈশোর পেরোনো এই নারী। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর মিনারার ঠাঁই হয়েছে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে। এখন নিজের ও সন্তানের আহার জোগাড়ের চিন্তায় সময় কাটে তার। এর মাঝে একটু অবসর পেলেই স্বামী হারানোর ব্যাথা তাড়িয়ে বেড়ায় জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়ে যাওয়া মিনারাকে।

শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কথা হয় এই রোহিংগা নারীর সঙ্গে। মিনারা জানান, কোরবানি ঈদের আগের দিন ২৫ আগস্ট ভোরে তাদের পাড়ায় আক্রমণ চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসময় অন্যদের মতো স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন আয়াতুল্লাহ। পথে তাদের ধরে ফেলে সেনাবাহিনী। পাড়ার সবার সামনে আয়াতুল্লাহর মাথায় প্রথমে গুলি করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আয়াতুল্লাহ। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি মগ সেনাদের এই পাশবিক হত্যাযজ্ঞ। সবার সামনে আয়াতুল্লাহর গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করা হয়। এসময় হত্যাকারীরা বলছিল-‘এখানে থাকলে সবাইকে গুলি করবো, কেটে ফেলবো,  মেরে ফেলব, সবাই বাংলাদেশে চলে যাও।’

মিনারা বলেন, ‘সবাইকে ভয় দেখানোর জন্য সেনাবাহিনী আমার স্বামীকে মেরে ফেলেছে। তারা বুঝিয়ে দিচ্ছিল-তোমরা বাংলাদেশে যাবে কিনা বলো, এখানে থাকলে তোমাদেরও এ অবস্থা হবে। ছেলেকে বাঁচাতে স্বামীর লাশ রেখে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। মিণারা আরো বলেন প্রথমে ছেলেকে নিয়ে ৩ ঘণ্টা ধান ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলাম। তারপর পেছনের পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলাম আরও একদিন। পরে সবার সঙ্গে ৯ দিন ধরে হেঁটে ৩ বছরের ছেলেকে বুকে নিয়ে উখিয়ার বালুখালী দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি। ’ ওপারে পয়সাওয়ালা ছিলেন এমন স্মৃীতি উল্লেখ করে মিনারা বলেন, ওখানে আমাদের তিনটা গরু ছিল, নিজেদের জমি ছিল, সেখানে আমার স্বামী চাষাবাদও করতো। কোন অভাব ছিল না। ওখানে আমরা পয়সাওয়ালা ছিলাম। আসার সময় ৫০ হাজার টাকা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সব পথখরচে চলে গেছে। এখন আমাদের কিছুই নেই। আমরা নিঃস।

স্বামীর শোকে কাতর এই নারী বলতে থাকেন, ‘স্বামীর জন্য একটু চোখের পানি ফেলার সময়ও পাইনি। তার আগেই প্রাঁণ বাচাঁতে চলে আসতে হয়েছে। ওনার জন্য অনেক খারাপ লাগে। যখন দেখি অন্য মেয়েদের স্বামীরা ত্রাণ নিয়ে আসতে, বউয়ের জন্য অন্য জিনিস নিয়ে আসতে, তখন অনেক কষ্ট হয়। মনে হয় আমার তো কেউ নেই, কোন অভিভাবক নেই। আমি একা। তখন চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারি না। ’ নিজের ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে চান কিনা জানতে চাইলে মিনারার উত্তর-‘ওখানে আর ফেরার ইচ্ছা নেই। তবে যদি বাংলাদেশ আমাদের তাড়িয়ে দেয় তখন তো যেতে হবে।’ গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনাচৌকিতে একযোগে হামলা চালায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। এর জেরে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলি আর মগদের নৃশংসতার মুখে টিকতে না পেরে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন রোহিঙ্গারা। বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

রক্তাক্ত স্বামীর লাশ ফেলে কোলের শিশুকে নিয়ে প্রাণে বেচেঁ আসলেন মিনারা

আপডেট সময় : ১০:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০১৭

বশির আলমামুন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ  চার বছর আগে মিয়ানমারের মংডু জেলার ধুমবাইয়ের পল্লি চিকিৎসক আয়াতুল্লাহর সাথে বিয়ে হয় মিনারা বেগমের (১৮)। বিয়ের এক বছরের মাথায় কোলজুড়ে আসে এক শিশুসন্তান। স্বামী-ছেলেকে নিয়ে সুখেই কাটছিল মিনারার দিন। আর সেই স্বামীকে চোখের সামনেই বার্মার মগ সেনা ও বর্বর মগদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হতে দেখেছে মিনারা। এই কঠিন  সময়ে স্বামীর রক্তাক্ত নিথর দেহ ফেলে একমাত্র ছেলের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে মিনারাকে। স্বামীর দেহ ছুঁয়ে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলারও সময় পায়নি সদ্য কৈশোর পেরোনো এই নারী। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর মিনারার ঠাঁই হয়েছে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে। এখন নিজের ও সন্তানের আহার জোগাড়ের চিন্তায় সময় কাটে তার। এর মাঝে একটু অবসর পেলেই স্বামী হারানোর ব্যাথা তাড়িয়ে বেড়ায় জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়ে যাওয়া মিনারাকে।

শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কথা হয় এই রোহিংগা নারীর সঙ্গে। মিনারা জানান, কোরবানি ঈদের আগের দিন ২৫ আগস্ট ভোরে তাদের পাড়ায় আক্রমণ চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসময় অন্যদের মতো স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন আয়াতুল্লাহ। পথে তাদের ধরে ফেলে সেনাবাহিনী। পাড়ার সবার সামনে আয়াতুল্লাহর মাথায় প্রথমে গুলি করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আয়াতুল্লাহ। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি মগ সেনাদের এই পাশবিক হত্যাযজ্ঞ। সবার সামনে আয়াতুল্লাহর গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করা হয়। এসময় হত্যাকারীরা বলছিল-‘এখানে থাকলে সবাইকে গুলি করবো, কেটে ফেলবো,  মেরে ফেলব, সবাই বাংলাদেশে চলে যাও।’

মিনারা বলেন, ‘সবাইকে ভয় দেখানোর জন্য সেনাবাহিনী আমার স্বামীকে মেরে ফেলেছে। তারা বুঝিয়ে দিচ্ছিল-তোমরা বাংলাদেশে যাবে কিনা বলো, এখানে থাকলে তোমাদেরও এ অবস্থা হবে। ছেলেকে বাঁচাতে স্বামীর লাশ রেখে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। মিণারা আরো বলেন প্রথমে ছেলেকে নিয়ে ৩ ঘণ্টা ধান ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলাম। তারপর পেছনের পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলাম আরও একদিন। পরে সবার সঙ্গে ৯ দিন ধরে হেঁটে ৩ বছরের ছেলেকে বুকে নিয়ে উখিয়ার বালুখালী দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি। ’ ওপারে পয়সাওয়ালা ছিলেন এমন স্মৃীতি উল্লেখ করে মিনারা বলেন, ওখানে আমাদের তিনটা গরু ছিল, নিজেদের জমি ছিল, সেখানে আমার স্বামী চাষাবাদও করতো। কোন অভাব ছিল না। ওখানে আমরা পয়সাওয়ালা ছিলাম। আসার সময় ৫০ হাজার টাকা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সব পথখরচে চলে গেছে। এখন আমাদের কিছুই নেই। আমরা নিঃস।

স্বামীর শোকে কাতর এই নারী বলতে থাকেন, ‘স্বামীর জন্য একটু চোখের পানি ফেলার সময়ও পাইনি। তার আগেই প্রাঁণ বাচাঁতে চলে আসতে হয়েছে। ওনার জন্য অনেক খারাপ লাগে। যখন দেখি অন্য মেয়েদের স্বামীরা ত্রাণ নিয়ে আসতে, বউয়ের জন্য অন্য জিনিস নিয়ে আসতে, তখন অনেক কষ্ট হয়। মনে হয় আমার তো কেউ নেই, কোন অভিভাবক নেই। আমি একা। তখন চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারি না। ’ নিজের ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে চান কিনা জানতে চাইলে মিনারার উত্তর-‘ওখানে আর ফেরার ইচ্ছা নেই। তবে যদি বাংলাদেশ আমাদের তাড়িয়ে দেয় তখন তো যেতে হবে।’ গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনাচৌকিতে একযোগে হামলা চালায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। এর জেরে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলি আর মগদের নৃশংসতার মুখে টিকতে না পেরে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন রোহিঙ্গারা। বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।