মৃত্যুর আগে মাকে ডা. আকাশ বলেছিল মা আমার কিছু হয়নি
- আপডেট সময় : ০৫:৪০:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
- / 309
চট্টগ্রাম ব্যুরো:
চট্টগ্রামের আলোচিত ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ আত্বহত্যার ঘটনার তিনদিন পর একাধিক সূত্র থেকে নানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। স্ত্রী ডা.তানজিলা হক চৌধুরী মিতু যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্ত্রীর দেশে আসার পর কোনো একসময় তার আপত্তিকর কিছু ছবি স্বামী আকাশের হাতে আসে। যেদিন আকাশ আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন, সেইদিন রাতে আপত্তিকর ছবিসহ অন্যান্য ছবি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া ও হাতাহাতি হয় দু জনের মধ্যে। পরে মিতুকে তার বাবা এসে নিয়ে গেলে এক পর্যায়ে তিনি নিজ কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন। ওইসময় আকাশ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ত্রীর ছবিগুলোসহ নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে সর্বশেষ স্ট্যাটাস দেন। পরে বাথরুমে ঢুকে নিজের শরীরে ইনসুলিন পুশ করেন। ছেলের অসংলগ্ন আচরণ কিছুটা আঁচ করে পরিবার। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা দরজা খুলতে বললেও তিনি দরজা খুলেননি। এক পর্যায়ে লাথি মেরে দরজাটি খোলা হয়। পরে সেখান থেকে আকাশ বেরিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, মা আমার কোনো কিছু হয়নি। শেষ বাক্যটি বলে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
গত ৩১ অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে নগরীর চান্দগাঁওয়ে নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন তরুণ চিকিৎসক আকাশ। আকাশের আত্মহননের পর তার পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ওই রাতেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আকাশের স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে নন্দনকানন এলাকা থেকে আটক করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের টিমসহ চান্দগাঁও পুলিশ। আটকের পরদিন সকালে সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান বলেছেন, বিভিন্ন ছেলের সাথে পরকীয়া ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আকাশ ও মিতুর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এক পর্যায়ে মিতুর বাবা এসে তার মেয়েকে নিয়ে যায়। পরে তিনি শরীরে ইনসুলিন ইনজেক্ট করে আত্মহত্যা করেন।
এদিকে ডা. আকাশের আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে গতকাল স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে নগরীর চান্দগাঁও থানায় মামলা করেছেন আকাশের মা জোবেদা খাতুন। মিতু ছাড়া মামলার অপর আসামীরা হলেন বাবা আনিছুল হক চৌধুরী, মা শামিমা শেলী,বোন তার মা শামীম শেলী (৪৯), বাবা আনিসুল হক চৌধুরী (৫৫), বোন সানজিলা হক চৌধুরী আলিশা (২১), দুই ছেলে বন্ধু ভারতীয় নাগরিক উত্তম প্যাটেল ও ডা. মাহবুবুল আলম (২৮)। এছাড়া ৩/৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, ২০১৬ সালে বিয়ের আগে ডা. মাহবুবুল হকের সঙ্গে, অন্যদিকে আমেরিকায় গেলে প্যাটেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায় মিতু। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা মানসিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মহত্যায় প্ররোচনা করেছিল আকাশকে।
আকাশের ছোট ভাই নওয়াজ মোর্শেদ বলেন, গত ১৪ জানুয়ারি আমেরিকা থেকে দেশে আসেন মিতু। প্রথমে ঢাকায়, পরে সন্ধ্যা নাগাদ চট্টগ্রামে আমাদের বাসায় পৌঁছেন।
জানা গেছে, মিতু দেশে আসার পর গত সতেরো দিনের মধ্যে কোনো একসময় মিতুও তার বয়ফ্রেন্ডের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি আকাশের হাতে আসে। ওইসব ছবি পাওয়ার পর তিনি কাউকে কিছু জানাননি।
একই ফ্ল্যাটে থাকা আকাশের এক চাচাতো বোন বলেন, আকাশের সঙ্গে স্ত্রীর কখনো ঝগড়া হয়েছে আমি শুনিনি। তিনি তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন। ৩১ অক্টোবর রাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দাওয়াত খেয়ে আনুমানিক রাত ২টায় বাসায় ফেরেন। কিছুক্ষণ পর মিতু বাসায় ঢুকে আবার বাইরে বেরিয়ে যান। এ সময় আকাশের মা তাকে বুঝিয়ে বাসায় নিয়ে আসেন।
আকাশের মা জোবেদা খাতুন বলেন, বৌমাকে নিয়ে আসার পর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই রুমে চলে যায়। ভেতরে তাদের মধ্যে কী হয়েছে তা জানি না। পরে মিতুর বাবা নাকি ড্রাইভার কে যেন গাড়ি নিয়ে এসে মিতুকে নিয়ে চলে যায়। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি খুনের বদলে খুন চাই।
শনিবার আকাশের বাসায় গিয়ে দেখাগেছে বাথরুমের ভেতর পড়েছিল ইনসুলিনের একটি ফাইল, ইনজেকশনের সিরিজের খালি প্যাকেট। ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল ইনসুলিনের কাচের শিশির টুকরো।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এ ঘটনাটি নিয়ে প্রচন্ড চাপে ছিল পুলিশ। তাকে যত দ্রুত সম্ভব আটক করা যায় সে ব্যাপারে নির্দেশনা ছিল পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছ থেকে। এতে করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ, কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগসহ পুলিশের একটি টিম মেয়েটিকে আটক করার জন্য অভিযানে নামে। সাড়ে তিনটায় পুলিশের ওই অভিযানটি শেষ করা হয়েছিল।
এদিকে, আকাশের ফেসবুকে মিতুর স্বীকারোক্তির এক ভিডিও ক্লিপস ওইদিন ধারণ করা হয়েছিল বলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন। মিতুর স্বীকারোক্তি থেকেই এটা নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ওই ভিডিও ক্লিপসে মিতুকে বিবাহের পর পরপুরুষের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করতে দেখা গেছে। এ সময় তার ঠোঁটের এক পাশে সামান্য রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়। ওই ক্লিপসে মিতুকে আতংকিত দেখা যায়।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।’শনিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রসিকিউশন শাখার মাধ্যমে আদালতে রিমান্ডের আবেদন জমা দেওয়া হয়। সোমবার রিমান্ডের শুনানি হতে পারে বলে আদালত সূত্রে জানাগেছে।




















