ঢাকা ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেজুরের রসে মিলল নতুন আতঙ্ক: এবার মানুষের শরীরে হানা দিল প্রানঘাতী ভাইরাস

  • আপডেট সময় : ০২:৫৫:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 111
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশে খেজুরের রস থেকে ছড়ানো রোগের তালিকায় এবার যুক্ত হলো এক নতুন নাম। এতদিন কাঁচা খেজুরের রস পানের মাধ্যমে মূলত ‘নিপাহ’ ভাইরাসের সংক্রমণের কথা শোনা যেত, কিন্তু এবার গবেষকরা শনাক্ত করেছেন বাদুড়-বাহিত আরও একটি নতুন ভাইরাস, যার নাম ‘টেরোপাইন অর্থোরিওভাইরাস’ (Pteropine orthoreovirus – PRV)।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরিতে বাংলাদেশি রোগীদের পুরোনো নমুনা পরীক্ষার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কাঁচা খেজুরের রস পানে মৃত্যুর ঝুঁকি কেবল নিপাহ ভাইরাসে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এই নতুন ভাইরাসটিও সমানভাবে প্রাণঘাতী হতে পারে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটি’ (CII) এবং বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর যৌথ গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা (ফরিদপুর, রাজবাড়ী, খুলনা ও সিরাজগঞ্জ) থেকে ৫ জন রোগী এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের উপসর্গগুলো হুবহু নিপাহ ভাইরাসের মতো ছিল এবং তারা সবাই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ল্যাব টেস্টে তাদের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন এই রহস্য সমাধানের পর, গবেষকরা অত্যাধুনিক ‘হাই-থ্রুপুট সিকোয়েন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ওই রোগীরা আসলে ‘টেরোপাইন অর্থোরিওভাইরাস’-এ আক্রান্ত ছিলেন।

গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে তীব্র উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে:

  • উচ্চমাত্রার জ্বর
  • মারাত্মক শ্বাসকষ্ট
  • সংজ্ঞাহীনতা বা অসংলগ্ন আচরণ (Encephalitis)
  • শিশুদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি

শনাক্ত হওয়া ৫ জন রোগীর মধ্যে ১ জন মারা গেছেন এবং বাকিরা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছেন। সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকে স্মৃতিভ্রম এবং শারীরিক দুর্বলতার শিকার হয়েছেন।

গবেষণার প্রধান লেখক ড. নিশ্চয় মিশ্র জানান, “আমাদের গবেষণা এটিই প্রমাণ করে যে কাঁচা খেজুরের রস পানের বিপদ শুধু নিপাহ ভাইরাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাদুড় এমন অনেক ভাইরাস বহন করে যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে এবং পিআরভি (PRV) তার মধ্যে একটি।”

আইইডিসিআর-এর পরিচালক ড. তাহমিনা শিরিন বলেন, “এটি বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা। এতদিন আমরা শুধু নিপাহ নেগেটিভ হলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম, কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে যে খেজুরের রসে আরও অজানা অনেক বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে।”

চিকিৎসকরা এবং আইইডিসিআর সাধারণ মানুষের প্রতি কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। এই নতুন ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি: ১. কাঁচা খেজুরের রস পান করা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ২. খেজুরের রস পান করতে চাইলে তা অবশ্যই ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পান করতে হবে। ৩. বাদুড় বা পাখির ঠোকরানো কোনো ফল খাওয়া যাবে না। ৪. খেজুরের রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ির মুখ জালি বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় মুখ দিতে না পারে।

শীত মৌসুমে খেজুরের রস খাওয়ার ধুম পড়ে যায় গ্রামে-গঞ্জে। তবে এই নতুন গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করে যে, সামান্য অসতর্কতা ডেকে আনতে পারে মৃত্যু বা আজীবনের পঙ্গুত্ব।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

খেজুরের রসে মিলল নতুন আতঙ্ক: এবার মানুষের শরীরে হানা দিল প্রানঘাতী ভাইরাস

আপডেট সময় : ০২:৫৫:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে খেজুরের রস থেকে ছড়ানো রোগের তালিকায় এবার যুক্ত হলো এক নতুন নাম। এতদিন কাঁচা খেজুরের রস পানের মাধ্যমে মূলত ‘নিপাহ’ ভাইরাসের সংক্রমণের কথা শোনা যেত, কিন্তু এবার গবেষকরা শনাক্ত করেছেন বাদুড়-বাহিত আরও একটি নতুন ভাইরাস, যার নাম ‘টেরোপাইন অর্থোরিওভাইরাস’ (Pteropine orthoreovirus – PRV)।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরিতে বাংলাদেশি রোগীদের পুরোনো নমুনা পরীক্ষার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কাঁচা খেজুরের রস পানে মৃত্যুর ঝুঁকি কেবল নিপাহ ভাইরাসে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এই নতুন ভাইরাসটিও সমানভাবে প্রাণঘাতী হতে পারে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটি’ (CII) এবং বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর যৌথ গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা (ফরিদপুর, রাজবাড়ী, খুলনা ও সিরাজগঞ্জ) থেকে ৫ জন রোগী এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের উপসর্গগুলো হুবহু নিপাহ ভাইরাসের মতো ছিল এবং তারা সবাই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ল্যাব টেস্টে তাদের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন এই রহস্য সমাধানের পর, গবেষকরা অত্যাধুনিক ‘হাই-থ্রুপুট সিকোয়েন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ওই রোগীরা আসলে ‘টেরোপাইন অর্থোরিওভাইরাস’-এ আক্রান্ত ছিলেন।

গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে তীব্র উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে:

  • উচ্চমাত্রার জ্বর
  • মারাত্মক শ্বাসকষ্ট
  • সংজ্ঞাহীনতা বা অসংলগ্ন আচরণ (Encephalitis)
  • শিশুদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি

শনাক্ত হওয়া ৫ জন রোগীর মধ্যে ১ জন মারা গেছেন এবং বাকিরা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছেন। সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকে স্মৃতিভ্রম এবং শারীরিক দুর্বলতার শিকার হয়েছেন।

গবেষণার প্রধান লেখক ড. নিশ্চয় মিশ্র জানান, “আমাদের গবেষণা এটিই প্রমাণ করে যে কাঁচা খেজুরের রস পানের বিপদ শুধু নিপাহ ভাইরাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাদুড় এমন অনেক ভাইরাস বহন করে যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে এবং পিআরভি (PRV) তার মধ্যে একটি।”

আইইডিসিআর-এর পরিচালক ড. তাহমিনা শিরিন বলেন, “এটি বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা। এতদিন আমরা শুধু নিপাহ নেগেটিভ হলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম, কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে যে খেজুরের রসে আরও অজানা অনেক বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে।”

চিকিৎসকরা এবং আইইডিসিআর সাধারণ মানুষের প্রতি কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। এই নতুন ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি: ১. কাঁচা খেজুরের রস পান করা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ২. খেজুরের রস পান করতে চাইলে তা অবশ্যই ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পান করতে হবে। ৩. বাদুড় বা পাখির ঠোকরানো কোনো ফল খাওয়া যাবে না। ৪. খেজুরের রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ির মুখ জালি বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় মুখ দিতে না পারে।

শীত মৌসুমে খেজুরের রস খাওয়ার ধুম পড়ে যায় গ্রামে-গঞ্জে। তবে এই নতুন গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করে যে, সামান্য অসতর্কতা ডেকে আনতে পারে মৃত্যু বা আজীবনের পঙ্গুত্ব।