নাগরিকত্বের নিবন্ধনের অপেক্ষায় সিরিয়ার কুর্দিরা
- আপডেট সময় : ০৫:২৭:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
- / 58
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্ক:
দশকের বঞ্চনার পর, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কামিশলি শহরের একটি স্টেডিয়ামের জনাকীর্ণ হলঘরে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে অপেক্ষা করছেন ফিরাস আহমাদ। তার মতো সেখানে সারিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষামান রয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন কুর্দি। বহু বছর ধরে এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনেকেই নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত।
গত সপ্তাহ থেকে ‘অনিবন্ধিত’ কুর্দিরা সিরিয়াজুড়ে নিবন্ধন কেন্দ্রে ভিড় করছেন। ১৯৬২ সালের বিতর্কিত আদমশুমারির পর থেকে তারা নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়েন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে তারা এখন নাগরিকত্বের আবেদন করছেন।
সিরিয়ার কামিশলি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
৪৯ বছর বয়সী আহমাদ বলেন, ‘নাগরিকত্ববিহীন একজন মানুষ কার্যত মৃতের মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাবুন তো, আমি আমার সন্তানদের বা আমাদের ঘরবাড়ি নিজের নামে নিবন্ধন করতে পারিনি।’
আহমাদ বলেন, ‘আমার দাদারও নাগরিকত্ব ছিল না। তখন থেকে আমরা কোনো সরকারি নথি ছাড়াই বসবাস করছি।’
দীর্ঘ সারির সামনে টেবিলগুলোতে ছড়িয়ে আছে নিবন্ধন ফরম, ব্যক্তিগত ছবি ও পুরোনো কাগজপত্র। সরকারি কর্মীরা সেগুলো নথিভুক্ত করছেন।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার জানুয়ারির এক ডিক্রির পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দেশে বসবাসরত কুর্দিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিন অনিবন্ধিতদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিক্রিতে কুর্দিদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে কুর্দি যোদ্ধা ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। সিরিয়ার উত্তর-পূবাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এক সময় কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে একটি চুক্তির মাধ্যমে কুর্দি প্রশাসনকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা হয়।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, ফেব্রুয়ারিতে সরকারি বাহিনী কুর্দি নিয়ন্ত্রিত হাসাকে ও কামিশলি শহরে প্রবেশ করে। মার্চে পূর্বাঞ্চলের জন্য প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে জ্যেষ্ঠ কুর্দি সামরিক নেতা সিপান হামোকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
-‘আমরা অনেক কষ্ট পেয়েছি’-
নাগরিকত্ব না থাকায়. দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। জন্মনিবন্ধন, সম্পত্তির মালিকানা নিবন্ধন, পড়াশোনা, চলাচল, ভ্রমণ ও কাজÑসবকিছুতেই ছিল বাধা।
অনেকের অস্তিত্বের পূর্ণ আইনি স্বীকৃতিই ছিল না।
পাঁচ সন্তানের মা গালিয়া কালাশ বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট পেয়েছি।’
তিনি কুর্দি ভাষায় বলেন, ‘আমার পাঁচ সন্তানের কেউ পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। আমরা কোথাও ভ্রমণও করতে পারিনি। এখনও আমাদের বাড়ি আমাদের নামে নিবন্ধিত নয়।’
১৯৬২ সালের বিতর্কিত আদমশুমারিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাসাকে প্রদেশে সিরিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ কুর্দির নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়।
হাসাকে অঞ্চলের ‘নেটওয়ার্ক অব স্টেটলেসনেস ভিকটিমস’-এর সদস্য আলি মুসা জানান, বর্তমানে সিরিয়ায় অন্তত দেড় লাখ অনিবন্ধিত মানুষ রয়েছে।
সিরিয়ায় মোট কুর্দির সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। তাদের অধিকাংশই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাস করেন।
কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মুসা বলেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ‘নমনীয়তা’ দেখাতে হবে। ইউরোপে শরণার্থী হিসেবে থাকা বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বিঘেœর আশঙ্কায় যারা দেশে ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্যও ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, নিবন্ধন কেন্দ্রগুলো এক মাস খোলা থাকবে।
সিরিয়া সরকারের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা আবদাল্লাহ আল-আবদাল্লাহ বলেন, এই সময় সীমা বাড়ানো হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এত বছর বঞ্চিত থাকার পর নাগরিকত্ব পাওয়াই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতিপূরণ।’
নিবন্ধন কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা ৫৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ আয়ো বলেন, নাগরিকত্ব না থাকায়, তিনি নিজেকে ‘অসহায়’ মনে করতেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স করা বা রাজধানী দামেস্কে হোটেল বুক করাও সম্ভব ছিল না, কারণ এর জন্য আগাম নিরাপত্তা অনুমোদন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আপনি বহু বছর পড়াশোনা করেন, শেষে বলা হয় আপনার কোনো সনদ নেই।’
তিনি আরও বলেন, উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি নথিও তিনি পাননি।
‘আমাদের নির্বাচন করার বা ভোট দেওয়ার অধিকারও ছিল না।’
বিডিসংবাদ/এএইচএস




















