ভাইয়েদের চাঁদাবাজি ও নেটওয়ার্কের জিম্মিতে জনজীবন
- আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / 2
বর্তমান সময়ে ‘আমি অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি’—এই পরিচয়টি যেন এক বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে অনেকেই অকপটে বলছেন, তারা কোনো নির্দিষ্ট কাজ করেন না, বরং এলাকার প্রভাবশালী কোনো ‘ভাই’-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। এই ‘ভাই’য়েরা মূলত চাঁদাবাজি, দখলদারি আর ভয় দেখানোর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন। শিল্পপতি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই তাদের মাসোহারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা এই দাবির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা হামলা বা নির্যাতনের শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও এই চাঁদাবাজ চক্রের নজর থাকে, ম্যানেজারদের হুমকি দিয়ে তারা ঋণের খবরাখবর নিয়মিত নিচ্ছে। বিখ্যাত চাঁদাবাজ হিসেবে তার নাম চারদিকে। চাঁদাবাজের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক শুধু রাজধানী বা শহরের অলিগলিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পৌঁছেছে বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ ও শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারী—সবাইকে চাঁদা গুনতে হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক দুর্বলতা ছাড়া এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যখন কোনো এলাকায় প্রশাসনের অগোচরে বা প্রশ্রয়ে এসব কর্মকাণ্ড চলে, তখন সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। এছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের ব্যবহার, অস্ত্র ও মাদকের অবাধ কারবার জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গাতে একই চিত্র।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতিটি অত্যন্ত জটিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা অনেক সময় পরিস্থিতি দেখেও অসহায় বোধ করেন। তার ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রমোশন বা পোস্টিং কেনাবেচার মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের বিনিয়োগের টাকা তুলতে চাঁদাবাজদের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়। এই চক্রে জড়িয়ে পড়লে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষে কঠোর হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মদত থাকায় অনেক সময় পুলিশের ওপর মহল থেকেও এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাধা আসে বা অকার্যকর নির্দেশ দেওয়া হয়। কথায় কথায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন। বলেন, আমরা দেখেও নাকি দেখি না।
সরকার পরিবর্তন হলেও এই চাঁদাবাজির কাঠামোর বিশেষ পরিবর্তন চোখে পড়ে না, বরং নতুন রূপে ও নতুন নেতৃত্বে এর বিস্তার ঘটে। টেন্ডার বাণিজ্য, বালুমহাল ইজারা কিংবা স্থানীয় নিয়োগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাসহ দখলবাজির নানা অভিযোগ আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও উঠেছে। ঢাকায় এমন পরিস্থিতির কারণে একজন আইনপ্রণেতাকে অপসারিত হতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখন অপরাধের ধরন বদলেছে; আগে পাচারের টাকা বিদেশি ব্যাংকে জমা হলেও বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনের ঝুঁকি কম ও নিরাপত্তা বেশি মনে করছে অপরাধীরা।
সর্বস্তরে চাঁদাবাজদের এই দৌরাত্ম্যে বিদেশগামী বাংলাদেশি নাগরিকরাও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। ছাড়পত্র পাওয়া থেকে শুরু করে কবরের জায়গা পাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়েও এখন ‘ভাই’দের শরণাপন্ন হতে হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চরম আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিরসনে প্রশাসনিক কঠোরতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সাধারণ মানুষের মুক্তি অসম্ভব বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চাঁদাবাজির এই মহামারি অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। উপরের তলায় খবর পাঠায়-স্যার, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতিরা মাস শেষে তাকে সম্মানী পাঠান। ব্যাংক থেকে কবে, কখন, কাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে এই নেটওয়ার্কও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে।
























