নিরাপত্তার অজুহাতে ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরির নতুন রাজনীতি
- আপডেট সময় : ০২:১১:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
ইসরাইল দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের অস্তিত্বের হুমকির দোহাই দিয়ে সামরিক আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী নীতিকে বৈধতা দিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনেই তারা নিরাপত্তাঝুঁকির বয়ান ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের অনেক রাজনৈতিক নেতা রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার অজুহাত তুলে ঠিক একই ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। এই ধরনের কৌশল যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতাকে স্তিমিত করার একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নিবন্ধে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে। ইউরোপে রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।
নিরাপত্তার নামে তৈরি করা এই স্থায়ী ভীতি মূলত সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করার পথ প্রশস্ত করে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিপক্ষকে এমন একটি ভয়ংকর হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যেখানে আলোচনার চেয়ে অবিরাম সংঘাতকেই একমাত্র সমাধান মনে হয়। যদিও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব সংকট রয়েছে, কিন্তু এসব উদ্বেগ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।
তবে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় রাশিয়ার তাৎক্ষণিক হামলার প্রস্তুতির সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে এক বৈঠকে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিন্ডাউগাস সিঙ্কেভিচিয়াস রাশিয়ার আসন্ন হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এমন সতর্কবার্তা ইউরোপের অন্যান্য নেতাদের অতিরঞ্জিত বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
এ ছাড়াও পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিভিন্ন সময়ে ন্যাটো ভূখণ্ডে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই রাজনৈতিক সতর্কবার্তার মিল খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। অক্টোবরের শুরুতে বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেন রুশ ড্রোন শনাক্তের দাবি তুললেও, দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম ভিআরটি অনুসন্ধানে এমন কোনো ঘটনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর স্বার্থেই এমন কাল্পনিক হুমকির বয়ান তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপের কিছু রাজনৈতিক মহল এখন রাশিয়ার সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বদলে বৈরিতাকে দীর্ঘায়িত করতে মরিয়া। ইসরাইলের ক্ষেত্রে যেমন হলোকাস্ট-পরবর্তী অপরাধবোধকে কাজে লাগিয়ে তারা পশ্চিমা সমর্থন আদায় করে, একইভাবে ইউরোপের এই নেতারা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নিজেদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের চেষ্টা করছেন। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসরাইল যেভাবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বয়ানের মাধ্যমে আলোচনার দরজা বন্ধ করে রেখেছে, ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল রয়েছে।
নিরাপত্তার নামে এই স্থায়ী জরুরি অবস্থা তৈরির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়া। যখনই নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে যেকোনো সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশপ্রেমহীন অবস্থান হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্ক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। দিনশেষে, এই কৌশল কেবল সংঘাতের মাত্রাকেই বাড়ায়, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাস্তব নিরাপত্তা উদ্বেগকে যখন রাজনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কেবল বর্তমান পরিস্থিতিকেই জটিল করে তোলে না, বরং অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধের ঝুঁকিকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।























