ঢাকা ০১:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রী: জুলাইকে ধারণ করে না তাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনে অনুপস্থিত ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা বাড়াল পাকিস্তান ফ্রান্সে বিক্ষোভের জেরে ২৪০০ জন গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরে বিয়ের কেনাকাটার দিনে তরুণীর অস্বাভাবিক মৃত্যু উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য ১৮ জনের স্কোয়াড চূড়ান্ত করল ইশরাক: দুপুরে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব সৌদিতে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত দুই ক্রু আগামী ২০ অক্টোবর রাজশাহী সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুড়িগ্রামে ডিবি পরিচয়ে প্রতারণা, ভুয়া পুলিশ সদস্য আটক

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

  • আপডেট সময় : ১০:৫২:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 5
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রদর্শনকারী অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতা-উত্তর সরকার রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করলেও, ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকার সে সময় অন্যতম মূলনীতি হিসেবে কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে প্রাধান্য দেয়। সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’ এই সংজ্ঞায়ন মূলত বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ভারতের পশ্চিমবাংলার বাঙালি থেকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে যুক্ত হলেও, তা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতির পথ রুদ্ধ করে দেয়। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি অসমসাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

সেই সময়কার শাসকগোষ্ঠীর জাতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই প্রবল ছিল যে, অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময়ে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উন্নীত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। গবেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের মানসিকতা বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক চিন্তারই প্রতিফলন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তার সাথে এই মানসিকতার সাদৃশ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও অবাঙালিদের ক্ষেত্রে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী বিশেষণের প্রয়োগ বন্ধ হয়নি। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এক নতুন জটিলতা তৈরি করে। সংশোধনীতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ এই ধারাটি অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোর স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়কে বাঙালির ছায়াতলে নিয়ে আসে। একই সাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা এবং রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করার ক্ষেত্রেও এক ধরণের পরস্পরবিরোধী ও সুবিধাবাদী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা—এই দুই বৈপরীত্য আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক বলে অনেকে মনে করেন। “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। সর্বোপরি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম-বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ দান করে সংখ্যালঘু নাগরিক সম্প্রদায় সমূহের ধর্ম বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে নামিয়ে আনে, সে প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয় ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ থাকে না।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলোতে ভাষা, শিক্ষা ও ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে যে শোষণমূলক কাঠামো তৈরি করেছিল, তা আজও উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ গ্রন্থেও ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এমন জাতিবাদী চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। ড. মিজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত ‘দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অফ বাংলাদেশ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ এবং আনিসুজ্জামানের ‘বাঙালী ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থেও এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক ফুটে উঠেছে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে।

বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল অতীতকে অভিসম্পাত নয়, বরং নতুন ও সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই নেতিবাচক অবশেষ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ প্রতিটি উপনিবেশোত্তর দেশকে যথার্থ মুক্তি অর্জনের জন্য ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি, ভাষা-রাজনীতি এবং ধর্মীয় আধিপত্যবাদের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। শাসকশ্রেণির মন ও মননের বিউপনিবেশায়ন ছাড়া প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব।

নিউজটি শেয়ার করুন

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

আপডেট সময় : ১০:৫২:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রদর্শনকারী অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতা-উত্তর সরকার রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করলেও, ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকার সে সময় অন্যতম মূলনীতি হিসেবে কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে প্রাধান্য দেয়। সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’ এই সংজ্ঞায়ন মূলত বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ভারতের পশ্চিমবাংলার বাঙালি থেকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে যুক্ত হলেও, তা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতির পথ রুদ্ধ করে দেয়। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি অসমসাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

সেই সময়কার শাসকগোষ্ঠীর জাতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই প্রবল ছিল যে, অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময়ে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উন্নীত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। গবেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের মানসিকতা বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক চিন্তারই প্রতিফলন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তার সাথে এই মানসিকতার সাদৃশ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও অবাঙালিদের ক্ষেত্রে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী বিশেষণের প্রয়োগ বন্ধ হয়নি। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এক নতুন জটিলতা তৈরি করে। সংশোধনীতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ এই ধারাটি অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোর স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়কে বাঙালির ছায়াতলে নিয়ে আসে। একই সাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা এবং রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করার ক্ষেত্রেও এক ধরণের পরস্পরবিরোধী ও সুবিধাবাদী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা—এই দুই বৈপরীত্য আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক বলে অনেকে মনে করেন। “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। সর্বোপরি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম-বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ দান করে সংখ্যালঘু নাগরিক সম্প্রদায় সমূহের ধর্ম বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে নামিয়ে আনে, সে প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয় ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ থাকে না।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলোতে ভাষা, শিক্ষা ও ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে যে শোষণমূলক কাঠামো তৈরি করেছিল, তা আজও উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ গ্রন্থেও ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এমন জাতিবাদী চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। ড. মিজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত ‘দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অফ বাংলাদেশ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ এবং আনিসুজ্জামানের ‘বাঙালী ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থেও এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক ফুটে উঠেছে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে।

বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল অতীতকে অভিসম্পাত নয়, বরং নতুন ও সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই নেতিবাচক অবশেষ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ প্রতিটি উপনিবেশোত্তর দেশকে যথার্থ মুক্তি অর্জনের জন্য ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি, ভাষা-রাজনীতি এবং ধর্মীয় আধিপত্যবাদের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। শাসকশ্রেণির মন ও মননের বিউপনিবেশায়ন ছাড়া প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব।