ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালো আইএমএফ আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিয়ে বিধিনিষেধ: বাড়ছে ক্ষোভ ও বিতর্ক নির্ধারিত দামেও মিলছে না এলপিজি, বাজারে চরম অস্থিরতা নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি এলপিজি বিক্রি, বিপাকে সাধারণ গ্রাহক শাহজালালে কোটি টাকার হীরা ও স্বর্ণালংকারসহ যাত্রী আটক চকবাজারে মার্কেটে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০ ইউনিট সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠালেন আদালত ঈশ্বরদীতে বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা: অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তুঙ্গে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নভেম্বরেই চালু হতে পারে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিয়ে বিধিনিষেধ: বাড়ছে ক্ষোভ ও বিতর্ক

  • আপডেট সময় : ১০:৫৬:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 0
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মুসলিমপ্রধান দেশ আজারবাইজানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকাদের হিজাব পরার ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় বড় ধরনের বিতর্ক ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নতুন এই পদক্ষেপের ফলে অনেক স্কুলে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্লাসে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মাসে অনুমোদিত এক সংশোধনীর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ না করলেও, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি’ বজায় রাখার অজুহাতে স্কুল ড্রেস কোডের নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। যদিও দেশটির ৯৬ শতাংশ নাগরিক মুসলিম, তথাপি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, স্কুলে ঢুকতে বাধা দেয়ার সময় শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সংবাদ সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পোশাকবিধি শিক্ষকদের পেশাগত মান বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং স্কুলের জনসমক্ষে ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে আজারবাইজানের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছেন। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিবাদ চলছে। শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা তার কষ্টের কথা প্রকাশ করে বলেন, তাকে স্কুলে হিজাব পরে আসার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে আবেগপ্রবণ করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, হিজাব ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং এটি খুলে ফেলা বা রাখা সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সত্যি বলতে, আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএ জানিয়েছে, এই পোশাকবিধির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি অভিন্ন মান নিশ্চিত করা। আজারবাইজানের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা থাকলেও, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে বিশেষ উদযাপনের সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে এর জন্য বিজ্ঞান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পেডাগজিক্যাল কাউন্সিলের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। সমালোচকদের মতে, সরকারি এই অবস্থান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজারবাইজানের জনগণের ‘ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের’ প্রতিফলন ঘটে এমন পোশাক বিশেষ উদ্যাপনের সময় পরার অনুমতি দেয়া হতে পারে।

এদিকে কারাবন্দি সাংবাদিক পোলাদ আসলানোভ এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন। ২০২০ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১১৩ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসলানোভ তার স্ত্রীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত হওয়ার প্রতিবাদেই তিনি এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন। একই সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার গুঞ্জন উঠলেও নেটব্লকস বা ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেরেন্সের মতো সংস্থাগুলো থেকে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। আসলানোভের স্ত্রী গুলমিরা আসলানোভার ফেসবুক পোস্টে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও আমার হাতে থাকা সংগ্রামের একমাত্র উপায় অনশন।

প্রতিবাদের ঢেউ দেশের সীমানা পেরিয়ে তুরস্কেও আঘাত করেছে। ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীরা এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে তা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন। অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে তুরস্কের ১৯৯৭ সালের ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যখন হিজাব পরিহিত নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে চরম বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল।

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তার মিত্র দেশ তুরস্কের জনগণের এই প্রতিবাদের বিষয়ে পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিউ আজারবাইজান পার্টির সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রায় বাইরের কারও হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। যদিও তিনি তুরস্কের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবুও তার এই বক্তব্যকে আঙ্কারার প্রতি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান গত ২৩শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে এই সংকট আজারবাইজানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিয়ে বিধিনিষেধ: বাড়ছে ক্ষোভ ও বিতর্ক

আপডেট সময় : ১০:৫৬:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মুসলিমপ্রধান দেশ আজারবাইজানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকাদের হিজাব পরার ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় বড় ধরনের বিতর্ক ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নতুন এই পদক্ষেপের ফলে অনেক স্কুলে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্লাসে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মাসে অনুমোদিত এক সংশোধনীর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ না করলেও, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি’ বজায় রাখার অজুহাতে স্কুল ড্রেস কোডের নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। যদিও দেশটির ৯৬ শতাংশ নাগরিক মুসলিম, তথাপি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, স্কুলে ঢুকতে বাধা দেয়ার সময় শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সংবাদ সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পোশাকবিধি শিক্ষকদের পেশাগত মান বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং স্কুলের জনসমক্ষে ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে আজারবাইজানের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছেন। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিবাদ চলছে। শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা তার কষ্টের কথা প্রকাশ করে বলেন, তাকে স্কুলে হিজাব পরে আসার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে আবেগপ্রবণ করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, হিজাব ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং এটি খুলে ফেলা বা রাখা সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সত্যি বলতে, আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএ জানিয়েছে, এই পোশাকবিধির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি অভিন্ন মান নিশ্চিত করা। আজারবাইজানের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা থাকলেও, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে বিশেষ উদযাপনের সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে এর জন্য বিজ্ঞান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পেডাগজিক্যাল কাউন্সিলের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। সমালোচকদের মতে, সরকারি এই অবস্থান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজারবাইজানের জনগণের ‘ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের’ প্রতিফলন ঘটে এমন পোশাক বিশেষ উদ্যাপনের সময় পরার অনুমতি দেয়া হতে পারে।

এদিকে কারাবন্দি সাংবাদিক পোলাদ আসলানোভ এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন। ২০২০ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১১৩ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসলানোভ তার স্ত্রীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত হওয়ার প্রতিবাদেই তিনি এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন। একই সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার গুঞ্জন উঠলেও নেটব্লকস বা ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেরেন্সের মতো সংস্থাগুলো থেকে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। আসলানোভের স্ত্রী গুলমিরা আসলানোভার ফেসবুক পোস্টে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও আমার হাতে থাকা সংগ্রামের একমাত্র উপায় অনশন।

প্রতিবাদের ঢেউ দেশের সীমানা পেরিয়ে তুরস্কেও আঘাত করেছে। ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীরা এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে তা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন। অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে তুরস্কের ১৯৯৭ সালের ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যখন হিজাব পরিহিত নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে চরম বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল।

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তার মিত্র দেশ তুরস্কের জনগণের এই প্রতিবাদের বিষয়ে পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিউ আজারবাইজান পার্টির সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রায় বাইরের কারও হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। যদিও তিনি তুরস্কের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবুও তার এই বক্তব্যকে আঙ্কারার প্রতি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান গত ২৩শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে এই সংকট আজারবাইজানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।