ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন অধরা, লিবিয়ায় নিখোঁজ মাদারীপুরের সাইদুল
- আপডেট সময় : ১১:৫৯:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 15
ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো সাইদুল বেপারীর (৩২) কোনো সন্ধান না মেলায় মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার তার পরিবারে চলছে চরম অনিশ্চয়তা। গত দুই মাস ধরে সাইদুলের কোনো খবর নেই। লিবিয়ায় পাড়ি জমানোর পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম প্রতিদিন দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, এই আশায় যে হয়তো ছেলে ফিরে আসবে। কখনো দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো পাশে বসে কাঁদেন। ছেলের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার পুরো পরিবারের। মায়ের চোখে ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা, আর তার স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের চোখে বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।
২২ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, সাইদুলের বাড়িতে শোকের ছায়া ও নীরবতা। মা সূর্যবান বেগম জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পরিবারের জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা এবং সুদে টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলে কোথায় আছে বা কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজায় তাকিয়ে থাকি, মনে হয় এই বুঝি সে ডাকবে।’ আবার কখনো নীরবে চোখের পানি মুছে মনে মনে প্রশ্ন করেন, ‘আমার ছেলে কোথায়, কেমন আছে, খেয়েছে তো?’। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাইদুলের বাড়িতে এক ধরনের নীরবতা। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই।’।
সাইদুলের স্ত্রী মেরি আক্তারও দুই সন্তানকে নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। চার বছর বয়সী মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য মোবাইল হাতে নেয়, কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া আসে না। এ দৃশ্য দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ১১ মাস বয়সী ছোট সন্তান বাবার উপস্থিতি বুঝতে না পারলেও পরিবারের অন্নসংস্থানের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। স্বজন জলিল বেপারী জানান, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ থাকায় স্থানীয়দের সহযোগিতায় কোনোমতে সংসার চলছে। কিন্তু ফোনের ওপাশে বাবার কণ্ঠ আর শোনা যায় না। আর ১১ মাসের ছেলে এখনো বুঝতেই পারে না কেন তার বাবা কাছে নেই।
সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ, স্থানীয় দালালেরা ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাইদুলকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পরে মাফিয়ার কাছে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় ৩৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এখন তাদের সহায়-সম্বল কিছুই অবশিষ্ট নেই। তারা ঘটনার বিচার ও সাইদুলের সন্ধান দাবি করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটকচর এলাকার আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকায় সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর চুক্তি করেন। ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয় এবং ৯ জুন তাকে শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে জিম্মি করে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে বাকি টাকা নেওয়া হয়েছে। সবশেষে গত দুই মাস ধরে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে সালিশ করেও কোনো সমাধান না পেয়ে ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে মাদারীপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তারসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু। তিনি জানান, তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে আনোয়ারের স্ত্রী শিল্পী আক্তার দাবি করেন, তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, তারা সাইদুলের পরিবারের মামলার বিষয়টি অবগত হয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে তা নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
























