বঙ্গবন্ধু এ পোয়েট অব পলিটিক্স
- আপডেট সময় : ১১:৩৫:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪
- / 755
হাসিনা মরিয়ম
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। লোকে লোকারণ্য সেই সভায় বঙ্গবন্ধু ভাষন দিলেন। সাতই মার্চের সেই ভাষন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। এর দুই সপ্তাহ পরেই ২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে আন্দোলনের একপর্যায়ে মার্চের প্রথম দিন থেকেই উত্তাল হয়ে উঠছিল ঢাকার রাজপথ। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড়ানো হয়েছে। পাঠ করা হয়েছে স্বাধীনতার ইশতেহার এবং নির্বাচন করা হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত।
কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার প্রশ্নে বা আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত কবে দেবেন, সে জন্যই ছিল মানুষের অধীর অপেক্ষা। আন্দোলন এবং মানুষের আকাংখা বিবেচনায় নিয়েই শেখ মুজিব ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্র সমাবেশে ৭ই মার্চ ভাষন দেয়ার ঘোষনা করেছিলেন। একদিকে আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার চাপ ছিল, অন্যদিকে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষনার দাবিতে ছাত্র নেতাদের একটা অংশ চাপ তৈরী করেছিল। সাথে সাথে আলোচনার পথ ও খোলা রাখা হয়েছিল। শেখ মুজিব ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে জাতীয় নেতা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেন। ৬ই মার্চ রাতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামীলীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করেছিলেন। সামরিক শাসন তুলে নেয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছিলেন।
৭ই মার্চের সেই ভাষন তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন,ভাষনটি লিখিত ছিলনা। ৭ই মার্চ সকাল থেকেই ঢাকায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ীতে ছিল আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতা এবং ছাত্রনেতাদের ভিড়। দুপুর দুইটার দিকে আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ সহ তরুন নেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে শেখ মুজিব তার বাড়ী থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন জনসভার উদ্দেশে, ভাষন দিতে বাসা থেকে বেরোনোর সময় শেখ মুজিবকে তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন, তুমি যা বিশ্বাস করো তাই বলবে, এদিকে সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা পরিনত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। সোহরাওয়ার্দীউদ্যান সে সময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। সেই রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অপেক্ষার পালা শেষ করে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী এবং হাতাকাটা কালো কোট পড়ে শেখ মুজিব উপস্থিত হয়েছিলেন। আগের দিনের নির্ধারিত রাস্তা বাদ দিয়ে ভিন্নপথে উনাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মঞ্চে সকাল থেকেই গনসঙ্গীত চলছিল, সেদিন শেখ মুজিব সেই মঞ্চে একাই ভাষন দিয়েছিলেন। ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষনা আসতে পারে, মানুষের মধ্যে এ ধরনের প্রত্যাশা তৈরী হয়েছিল। প্রায় ১৮ মিনিটের এই ভাষনে সবদিকই উঠে এসেছিল। বঙ্গবন্ধুকে যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয় সেইজন্য তিনি চারটি শর্ত দিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় নেননি। অন্যদিকে এই একটি ভাষনের মাধ্যমে তিনি একটি জাতিকে সশস্ত্র বাঙালী জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন, স্বাধীনতার বীজ-তিনি বপন করেছিলেন।
তিনি বলেছেন, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম ,ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো। এই বক্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু একটি গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। জনসভায় লাঠি, ফেষ্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষনের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা, ভাষন শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে শ্লোগান মুখরিত হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো। মুলত এই ভাষনটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিল। এমন কোন কথা নেই যা বঙ্গবন্ধু এই ভাষনে বলে যাননি। রেসকোর্স ময়দানের জনসভা পরিনত হয় এক জনসমুদ্রে। ৭ই মার্চের ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। ৭ মার্চের ভাষণ আড়াই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। লেখক ও ইতিহাসবিদ “জেকব এফ-ফিল্ড” এর বিশ্বসেরা ভাষন নিয়ে লেখা গ্রন্থে এ ভাষন স্থান পেয়েছে। অসংখ্য ভাষায় অনুদিত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন বিশ্ববাসীর কাছে বিশেষ করে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে আলোর দিশারীতে পরিণত হয়েছে। এ ভাষন দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী- দুঃশাষন থেকে বাঙালী জাতিকে মুক্তি দেয়ার জন্য। ১৯৪৮ সালে ভাষার দাবীতে আন্দোলন শুরু করার সময়ই বঙ্গবন্ধু বুঝে গিয়েছিলেন স্বাধীনতা ব্যতীত এই জাতির চূড়ান্ত মুক্তি মিলবে না। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে দেয়া জাতির পিতার এই কালজয়ী ভাষনে ধ্বনিত হয়েছিল বাংলার গনমানুষের প্রানের দাবী। এই ভাষনে তিনি বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ করেন। আবার সশস্র সংগ্রামের দিক নির্দেশনাও দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষনটি ছিল পরিমিত। কেউ কেউ সেদিনের ভাষনটিকে গ্যাটিসবার্গ ভাষনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গ্যাটিসবার্গ ভাষনের মতই বঙ্গবন্ধুর ভাষনটি ছিল অনন্য। আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল জেনেই গ্যাটিসবার্গে সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুরুর আগেই শেষটা দেখেছিলেন, তাই তিনি যুদ্ধ ও যুদ্ধের কৌশলের কথা এতো নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীল আছেন এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি-নিঃশেষে উদগ্রীব, তাও পশ্চিম পাকিস্তান ও বিশ্ববাসীকে জানালেন। কবি নির্মলেন্দু গুন শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষনকে বলেছেন একটি মহাকাব্য। আর সেই মহাকাব্যের মহাকবি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি গুনের কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে কবি অভিহিত করার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকার – কাগজে, কাগজটি শেখ মুজিবকে নাম দিয়েছিল “এ পোয়েট অব পলিটিক্স ”
সব মিলিয়ে ৭ই মার্চের ভাষন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সঠিক দিক নির্দেশনা ও সময়োপযোগী ঘোষনা।
হাসিনা মরিয়ম (সহকারী সম্পাদক, বিডিসংবাদ)




















