রান্নার অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে সিসার ঝুঁকি: মিলছে না সমাধান
- আপডেট সময় : ০৯:১৪:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি রান্নার পাত্রগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব পাত্রে রান্না করা খাবারের সাথে মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশ করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ সারাদেশের বাজারে থাকা এসব পণ্যের মান যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই এবং এদের মান নিয়ন্ত্রণের দায়ভারও যেন কেউ নিচ্ছে না। তবে বাস্তবতা হলো দেশের গৃহস্থালিসহ অসংখ্য খাবারের দোকানে রান্নার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিলসহ বিভিন্ন দ্রব্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিলের বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরনো কাপড়ের সঙ্গে এ ধরনের পাত্র বিনিময়ের সংস্কৃতি আছে। এরপর পাত্রগুলো গরম করে তাতে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআরবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে বিষাক্ত সিসা নির্গত হয়ে ভাতে বা খিচুড়িতে মিশে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রক্তে সিসার কোনো মাত্রাই নিরাপদ নয়। এই ভারী ধাতুটি বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও শারীরিক বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা মিশছে। নতুন পাত্রের ক্ষেত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিশুদের খাবারে সিসার সহনীয় মাত্রা প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম। এই হিসাবে গবেষণায় পাওয়া সিসার পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়।
অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ স্বীকার করেছেন যে, বেশিরভাগ কারখানায় মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, এটি পুরো ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা এবং সরকারসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এর সমাধান প্রয়োজন। কারখানাগুলোতে পুরনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে পণ্য তৈরির সময় সেগুলোতে কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না, তা যাচাই করার মতো কোনো প্রযুক্তি বা প্রক্রিয়া নেই বলেও তিনি জানান। সরকারসহ সবাই মিলে কাজ করে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।
চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি একরামুল হক জানান, বড় কিছু প্রতিষ্ঠান গুণমান বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ছোট অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের নিয়মই অনুসরণ করে না। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে জাহাজের ক্ষতিকর স্ক্র্যাপ ধাতু ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। নতুন পাত্র চকচকে হলেই যে তা নিরাপদ—এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই বলে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পাত্র ব্যবহারের ধরনের ওপর সিসা মেশার হার নির্ভর করে। নতুন পাত্র স্টিলের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে তা না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে ছড়িয়ে দেয়। একইভাবে ধাতব খুন্তি ব্যবহারের ফলেও সিসার পরিমাণ বেড়ে যায়। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা জানান, স্টিলের স্ক্রাবার ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং টকজাতীয় খাবার রান্না না করা কিছুটা সতর্কতা হলেও এটি কোনোভাবেই পাত্রটিকে শতভাগ নিরাপদ করে না। পরে পরীক্ষাগারে বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ মাপা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই-এর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইসিডিডিআরবির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছি। পাশাপাশি বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসা সংক্রান্ত নিরাপত্তা মান তৈরির অনুরোধ করা হয়েছে।
বিএসটিআই-এর পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন জানান, অ্যালুমিনিয়াম কুকওয়্যার উৎপাদনকারী ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তারা দুই দফা বৈঠক করলেও কোনো কার্যকর সাড়া পাননি। এসব উদ্যোক্তার অনেকের মধ্যেই পণ্যের মান বা হেভি মেটাল নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তবে বর্তমানে রান্নার পাত্রকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর নিরাপত্তা মান প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অ্যালুমিনিয়াম পাত্রের ঝুঁকির বিষয়টি তারা আমলে নিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পাত্র ব্যবহারে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় পর্যায়ে এর মান নির্ধারণের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
ন্যাচার জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফল সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রান্নার হাঁড়ি পাতিলের মান যাচাইয়ের এই ঘাটতি অদূর ভবিষ্যতে কতটা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
























