ইউক্রেন যুদ্ধে কেন বিতর্কিত ইলন মাস্কের স্টারশিল্ড
- আপডেট সময় : ০২:০৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধে সামরিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে স্পেসএক্সের ‘স্টারশিল্ড’ প্রযুক্তি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সেবার প্রবেশাধিকার ও গতিসীমা নিয়ে আরোপিত বিধিনিষেধ ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে বড় ধরনের বিপত্তি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউক্রেনের সেনারা জানায়, রাতভর স্টারশিল্ডের সামরিক পর্যায়ের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় প্রবেশাধিকার কমে যাওয়ায় তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সামরিক প্রযুক্তি উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ দাবি করেছেন, স্টারশিল্ডের সামরিক প্যাকেজে হঠাৎ গতি কমিয়ে দেওয়ার কারণে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলমান ডিভাইসগুলোর ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল, যার ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়।
সেরহি বেসক্রেস্তনভ আরও অভিযোগ করেন, এ ধরনের কোনো পরিবর্তন বা বিধিনিষেধের বিষয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। তিনি এটিকে নিছক কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তার ধারণা, বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের গভীর সংযোগ থাকতে পারে। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পর্কের অবনতি এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছিলেন জেলেনস্কি। গত সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার পর ট্রাম্প দুই দেশের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের ‘এনার্জি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করলেও জেলেনস্কি তা মস্কোর পক্ষ থেকে লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে যখন টানাপোড়েন চলছে, তখনই এ ঘটনা সামনে আসে। তবে জেলেনস্কি দ্রুতই মস্কোর বিরুদ্ধে সেই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। ওয়াশিংটনের চাপের মধ্যেই এসব হামলা চালানো হয়।
নিজের এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার এই ধরনের আকস্মিক পরিবর্তনে তিনি বিস্মিত। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, স্টারলিংক বা স্টারশিল্ডের মতো প্রযুক্তি সেবা যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে বুধবার কথা বলার সময় স্টারলিংকের সেবা ও গোয়েন্দা তথ্যপ্রাপ্তিতে ‘সমস্যা’ দেখা দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি ইঙ্গিত দেন, তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে স্টারলিংকের গতি কমানো হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে স্পেসএক্সের সিইও ইলন মাস্কের ভাষ্যমতে, স্টারশিল্ড ও সাধারণ স্টারলিংক সেবার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মাস্ক দাবি করেছেন, স্টারশিল্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে মার্কিন সরকারের হাতে। এই সেবার গতি বা ব্যবহার সীমিত করার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি মার্কিন সামরিক বাহিনী বা প্রেসিডেন্টের নির্দেশেই নেওয়া হয়, যেখানে তার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সীমিত। স্টারলিংক বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ; আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এর ব্যবহার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুচিত।
হোয়াইট হাউসের ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো অনুরোধ করা হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা পরে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সিদ্ধান্তটি হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকেই নেওয়া হয়েছিল।
ইউক্রেনের জাতীয় সংবাদ সংস্থা ইউক্রিনফর্ম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার নাগাদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের তথ্যানুযায়ী স্টারশিল্ড সেবা আবারও সচল হয়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনো তদন্ত বা পর্যালোচনার দাবি উঠছে।
স্টারশিল্ড হলো স্টারলিংকের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি সামরিক কর্মসূচি। এতে ১০ হাজারের বেশি স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক থাকলেও সাধারণ স্টারলিংকের তুলনায় এতে উন্নত এনক্রিপশন ও রাডারভিত্তিক ছবি সংগ্রহের মতো বিশেষ সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল ইন্টারনেট নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত চিত্র পেতে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে।
কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মার্ক হিলবোর্ন জানান, মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলা মোকাবিলা এবং রাশিয়ার ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য স্টারশিল্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ হলো ড্রোন অপারেটররা তাদের সরঞ্জাম থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক পরিণাম ডেকে আনতে পারে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো টড হ্যারিসন মন্তব্য করেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই ধরনের প্রযুক্তি ও চুক্তির বিস্তারিত তথ্য বরাবরই কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। ফলে প্রযুক্তিগত কোনো জটিলতা নাকি রাজনৈতিক কৌশল—তা নিয়ে বিতর্ক থেকে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
পরিশেষে, স্টারশিল্ড ও স্টারলিংক প্রযুক্তির মধ্যে প্রযুক্তিগত সম্পর্ক খুবই গভীর হওয়ায় তাদের পার্থক্য নির্ণয় সাধারণ মানুষের জন্য দুরূহ। তবে ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার আগ্রাসন রুখতে এই প্রযুক্তি এখন তাদের সামরিক সক্ষমতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, যেখানে সামান্যতম বাধা বা বিধিনিষেধ সরাসরি যুদ্ধের ফলাফলকে প্রভাবিত করছে।























