ইসরাইলের নির্বাচনে আরব ভোট ও নেতানিয়াহুর রাজনীতির হিসাব
- আপডেট সময় : ০১:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আরব নেতা মানসুর আব্বাস দেশ পরিচালনায় পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করছেন। এদিকে বিরোধীদের মধ্যেও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা ও দ্বিধা কাজ করছে। এই রাজনৈতিক স্ববিরোধিতাই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই স্ববিরোধিতাই হয়তো নির্ধারণ করবে যে, ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হবে কি না।
জেরুজালেম পোস্টের এক জরিপ অনুযায়ী, সরকার গঠনের লড়াইয়ে মূল দুটি শিবিরের প্রত্যেকের হাতেই ৫১টি করে আসন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের প্রত্যেকের আসনসংখ্যা ৫১ হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের সমীকরণটি বেশ জটিল হয়ে পড়েছে, কারণ আরব দলগুলোর ১৪টি আসন এবং অন্য একটি দলের ৪টি আসনের সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অসম্ভব। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্লোমো বেন-আমি মনে করেন, নেতানিয়াহুর বিরোধীদের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হলেও তারা এই অংশীদারিত্ব মেনে নিতে দোটানায় আছেন। যদিও নেতানিয়াহু নিজেও ২০২১ সালে মানসুর আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, তবুও এখন তিনি আরবদের অংশগ্রহণকে বিপজ্জনক বলে প্রচার করছেন। সম্প্রতি থেসালোনিকিতে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ আয়োজিত এক সম্মেলনে ইসরাইলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্লোমো বেন-আমি একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেন।
সহিংসতা দমনে আরব ও ইহুদি রাজনীতিকদের যৌথ উদ্যোগের নজিরও রয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব অধ্যুষিত এলাকায় শান্তি ফেরাতে আব্বাসের সঙ্গে ইয়োভ সেগালোভিৎজের অংশীদারিত্ব সফল হয়েছে। তবে বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ এবং গাদি আইজেনকোট এখনো আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের ব্যাপারে অনাগ্রহী। আবার আরব সমাজে গাজা ইস্যুতে আব্বাসের সংযত অবস্থানের সমালোচনাও রয়েছে, কারণ সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা কোনো রাজনৈতিক আপসের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে আব্বাসের সঙ্গে ইহুদি রাজনীতিক ইয়োভ সেগালোভিৎজের অংশীদারিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিষয়টিও নির্বাচনের মূল ইস্যুগুলোর একটি। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলা চলমান রয়েছে। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। চ্যানেল ১২-এর তথ্যানুযায়ী, হামাসের হামলার আগে নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়ে কৌশলগত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তবে তা সুনির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস ছিল না। এই প্রতিবেদনগুলো নিয়ে নেতানিয়াহু আপত্তি জানালেও, সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, নির্বাচনে জয় কখনোই আদালতের রায় বা তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও সম্পদে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। হামলার আগে নিরাপত্তা ও প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার বিষয়ে কৌশলগত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে। নেতানিয়াহু এসব প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। এই ধরনের তদন্তের বিরোধিতা করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কোনো নেতার শাসনামলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে, তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন না।
গাজায় সংঘাতের প্রভাব ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও পড়ছে। ফিলিস্তিনি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের প্রতি স্পষ্ট সমর্থন প্রকাশ করেননি। তবে কেবল নেতানিয়াহুর বিদায়ই সব সমস্যার সমাধান নয়; ইসরাইলের পরবর্তী সরকারকে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরাইলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। হামাসের হামলা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার অস্বীকার করাও অগ্রহণযোগ্য।
দীর্ঘস্থায়ী জরুরি অবস্থাকে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু একজন নেতাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা কোনো স্থায়ী জাতীয় কৌশল হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল ও ফিলিস্তিন—উভয় পক্ষের জন্য নিরাপদ সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করাই হবে টেকসই শান্তির একমাত্র পথ। এখন ইসরাইলের এমন একটি নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে এবং শান্তির বাস্তব রূপরেখা তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে।
























