এনআইডি জালিয়াতি রোধে কঠোর নির্বাচন কমিশন: অনেক কর্মকর্তা বরখাস্ত
- আপডেট সময় : ১১:৪৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের সুযোগকে পুঁজি করে সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার দাবি ও পাসপোর্ট পরিবর্তনের মতো গুরুতর জালিয়াতির প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে ইতোমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত পর্যন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের ঝুঁকিও থাকে। সম্প্রতি এনআইডি সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আসেন যশোরের কেশপুরের হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম)।
নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অনিয়মের ক্ষেত্রে কমিশন কোনো ছাড় দিচ্ছে না। তিনি বলেন, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত ও ফৌজদারি আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, এনআইডি সেবায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘সুতরাং আমরা ছাড় দিচ্ছি না।’।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে জালিয়াতির অভিযোগে ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ.
ছত্তার এবং পঞ্চগড় সদর নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
জালিয়াতি ঠেকাতে বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের প্রতিটি আবেদন গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। আবেদনকারীকে যথাযথ নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।
সিইসি জানান, নাম পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি বা নিজেকে উত্তরাধিকারী প্রমাণের মতো জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মতো বিদেশি নাগরিকরাও বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টা করছেন। তাই আবেদনগুলো নিবিড় তদন্ত ছাড়া অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু যাচাই ছাড়া অনুমোদন দিলে নির্বাচন কমিশনকেই সমস্যায় পড়তে হয়।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আবেদনকারীদের অনেকের তথ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকে। যেমন, ভোটার হওয়ার সময় বয়সের হিসাব বা নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে পরে সংশোধনের জন্য দেওয়া তথ্যের মিল নেই। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৭ সালে জন্ম নেওয়া কেউ যদি ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর না পূরণ করেই ২০০২ সালে জন্মসাল পরিবর্তনের আবেদন করেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। তিনি ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে বিদেশে যাওয়ার সমস্যা বা ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা তুলে ধরে মানবিক বিবেচনায় তথ্য সংশোধনের আবেদন করেন। সেসব পরিচয়পত্রে বাবার নামের সঙ্গে আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।
কমিশন কর্মকর্তারা আরও জানান, বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে কম দেখানো, একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার বা শিক্ষাগত সনদের তথ্যে গরমিল থাকার মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। শুধু হলফনামার ওপর ভিত্তি করে বাবা বা মায়ের নাম পরিবর্তনের সুযোগ নেই। প্রয়োজনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তখন জানানো হয়, তার স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। আবার কারও একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি বা স্নাতকের সনদ থাকায় কোন নথির তথ্য গ্রহণ করা হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। সিইসি জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব বা নথির অসামঞ্জস্যতার কারণে এই বিশাল সংখ্যক আবেদন বাতিল করতে হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই না করে সংশোধন করলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে কোনো আবেদন একবার বাতিল হলেই তা চূড়ান্ত নয়। যথাযথ নথিপত্রসহ আবেদনকারী পুনরায় আবেদন করতে পারেন। সচিব আখতার আহমেদ বলেন, একজন ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করতে পারেন এবং সচিব পর্যায়ে আপিলের সুযোগ থাকায় বাতিলের মোট সংখ্যাই ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারীর প্রকৃত সংখ্যা নির্দেশ করে না।
প্রবাসীদের এনআইডি সেবা সহজীকরণের বিষয়ে কমিশন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সিইসি জানান, সঠিক কাগজপত্র থাকলে প্রবাসীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চলছে। তবে অনেক প্রবাসী দালালদের মাধ্যমে বা ভুল তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট তৈরির পর এনআইডি সংশোধনে জটিলতায় পড়ছেন। বিশেষ করে সৌদি আরবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে কিছু রোহিঙ্গার কাজ করার প্রতিবেদনও ইসির নজরে এসেছে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বিবেচনায় তাদের সেবা অগ্রাধিকার দিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
পরিশেষে, নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য হলো নাগরিকেরা যেন শুরু থেকেই সঠিক তথ্য দিয়ে ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করেন। ঠিকানা পরিবর্তন বা বিয়ের মতো অনিবার্য ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতির মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, তবে মৌলিক তথ্যের ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।





















